শায়খ আহমাদুল্লাহ
অসুস্থ ব্যক্তির শুশ্রূষা উত্তম ইবাদত
শায়খ আহমাদুল্লাহ
সুস্থতা মহান আল্লাহর অমূল্য নেয়ামত। অসুস্থতাও মানুষের জীবনের এক অনিবার্য বাস্তবতা। তবে অসুস্থতা মুমিনের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ। ধৈর্য ও আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমে এই অসুস্থতাই তার গুনাহ মাফের বড় সুযোগ হয়ে উঠতে পারে। অসুস্থতার দিনগুলোতে মানুষ সাধারণত দুর্বল ও অসহায় হয়ে পড়ে। কখনো প্রচণ্ড হতাশাও ঘিরে ধরে। এমন সময় অসুস্থ ব্যক্তির পাশে থাকা, খোঁজখবর নেওয়া এবং সাধ্যমতো সেবা-শুশ্রূষা করা গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ। হাদিসের ভাষায় একে ‘ইয়াদাতুল মারিজ’ বলা হয়। ইসলাম কেবল আনুষ্ঠানিক ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বান্দার হক ও পারস্পরিক মানবিক দায়িত্ব পালনের প্রতি ইসলাম যে গুরুত্ব দিয়েছে, তা অতুলনীয়।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আজকের আধুনিক ও যান্ত্রিক জীবনে আমরা বড় আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছি। নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থ, ব্যস্ততা ও কাজ নিয়ে এতটাই ব্যস্ত থাকি, কাছের মানুষটির অসুস্থতার খবর নেওয়ার কথাটিও অনেক সময় মনে থাকে না। একান্ত কাছের মানুষের খোঁজ নিলেও অন্য প্রতিবেশী, সহকর্মী কিংবা যে অসুস্থ মানুষটির পাশ দিয়ে প্রতিদিন যাতায়াত করি, তার একটিবারও খোঁজ নেওয়া হয়ে ওঠে না। অথচ একজন অসুস্থ মানুষের জন্য আমাদের সামান্য আন্তরিকতাও হতে পারে তার অনেক বড় স্বস্তির কারণ। একই সঙ্গে এটি হতে পারে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক মহান মাধ্যম। ইসলামে রোগী দেখতে যাওয়া একজন মুসলমানের ওপর অপর মুসলমানের অন্যতম মৌলিক অধিকার বা হকের অন্তর্ভুক্ত। সহিহ বুখারির এক বর্ণনায় বারা ইবনে আজেব (রা.) উল্লেখ করেন, রসুল (সা.) আমাদের সাতটি বিষয়ের নির্দেশ দিয়েছেন এবং সাতটি বিষয়ে নিষেধ করেছেন। সেই নির্দেশিত বিষয়গুলোর অন্যতম প্রধান একটি হলো-অসুস্থ ব্যক্তির শুশ্রƒষা করা বা তাকে দেখতে যাওয়া। রসুল (সা.) নিজে শুধু সাহাবিদেরই নন, অমুসলিমদের অসুস্থতার খবরেও দেখতে যেতেন এবং আরোগ্যের জন্য দোয়া করতেন।
অসুস্থ মানুষকে দেখতে যাওয়ার মধ্যে মহান আল্লাহ যে বিপুল সওয়াব রেখেছেন, তা যেকোনো মুমিনের হৃদয়কে আন্দোলিত করবে। রসুল (সা.) বলেছেন, ‘যখন কোনো মুসলিম তার অসুস্থ মুসলিম ভাইকে দেখতে যায়, সে ফিরে না আসা পর্যন্ত জান্নাতের ফল বাগানে ফল আহরণে রত থাকে’ (মুসলিম)।
অন্য এক হাদিসে নবী করিম (সা.) সুসংবাদ দিয়ে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সকালে কোনো অসুস্থ মুসলমানকে দেখতে যায়, সন্ধ্যা পর্যন্ত সত্তর হাজার ফেরেশতা তার জন্য মাগফিরাতের দোয়া করতে থাকেন। আর যদি সন্ধ্যায় যায়, তবে সকাল পর্যন্ত সত্তর হাজার ফেরেশতা তার জন্য দোয়া করতে থাকেন এবং জান্নাতে তার জন্য একটি ফলের বাগান নির্ধারিত হয়’ (তিরমিজি)।
হাদিসে কুদসিতে এসেছে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ বান্দাকে বলবেন, ‘হে আদমসন্তান, আমি অসুস্থ হয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমাকে দেখতে আসনি।’ বান্দা বিস্মিত হয়ে বলবে, ‘হে রব, আপনি তো নিখিল বিশ্বের পালনকর্তা, আমি কীভাবে আপনাকে দেখতে যাব?’ আল্লাহ বলবেন, ‘তুমি কি জানতে না যে আমার অমুক বান্দা অসুস্থ ছিল? তুমি যদি তাকে দেখতে যেতে, তবে তার কাছেই আমাকে পেতে’ (মুসলিম)। অর্থাৎ রোগীর পাশে দাঁড়ানো মূলত আল্লাহর সন্তুষ্টি ও রহমতের সান্নিধ্য লাভ করার অনন্য মাধ্যম। রোগী দেখতে যাওয়া যেমন পুণ্যময় আমল, তেমনি এ ক্ষেত্রে কিছু শিষ্টাচার রক্ষা করাও অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় রোগীকে সান্ত্বনা দেওয়ার বদলে তা উল্টো বিরক্তি ও কষ্টের কারণ হতে পারে।
রোগী দেখতে যাওয়ার কয়েকটি আদব
১. উপযুক্ত সময় নির্বাচন : এমন সময়ে যাওয়া অনুচিত যখন রোগী বিশ্রাম নেন বা ঘুমান। হাসপাতালের নিয়ম ও রোগীর পরিবারের সুবিধার প্রতি খেয়াল রাখা আবশ্যক।
২. সংক্ষিপ্ত অবস্থান : রোগীর শিয়রে গিয়ে দীর্ঘ সময় বসে আড্ডা দেওয়া অনুচিত। অল্প সময় অবস্থান করে খোঁজখবর নিয়ে দ্রুত বিদায় নেওয়া উত্তম, যাতে রোগীর শারীরিক বিশ্রামে বিঘ্ন না ঘটে।
৩. আশাব্যঞ্জক ও সান্ত্বনামূলক কথা : রোগীর সামনে কোনো ভীতিজনক বা নেতিবাচক কথা বলা উচিত নয়। তাকে আল্লাহর রহমতের ব্যাপারে আশাবাদী করতে হবে। রসুল (সা.) রোগীর কাছে গিয়ে বলতেন : ‘লা বা’সা তুহুরুন ইনশাল্লাহ’ অর্থাৎ ভয় নেই, আল্লাহর ইচ্ছায় এই রোগ আপনার পাপমুক্তির ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যম হবে।
৪. সুন্নাহসম্মত দোয়া করা : রোগীর আরোগ্যের জন্য দোয়া করা সুন্নত। রসুল (সা.) শিখিয়েছেন, ‘আসআলুল্লাহাল আজিম, রব্বাল আরশিল আজিম, আঁই আশফিয়াক’। অর্থাৎ আমি মহান আরশের মালিক মহান আল্লাহর কাছে তোমার রোগমুক্তি কামনা করছি।
৫. রোগীর কাছে দোয়া চাওয়া : অসুস্থ অবস্থায় বান্দার অন্তর বিগলিত ও আল্লাহর অতি নিকটবর্তী থাকে। তাই রোগীর জন্য দোয়ার পাশাপাশি তার কাছ থেকেও দোয়া চেয়ে নেওয়া অত্যন্ত বরকতময়।
জুমার মিম্বর থেকে
♦ গ্রন্থনা : নুরুল ইসলাম তানঈম
বিডি প্রতিদিন