মুসলিম সভ্যতায় খোদাইশিল্পের বিকাশ
আতাউর রহমান খসরু
শিল্প ও নান্দনিকতার একটি প্রাচীন ধারা খোদাইশিল্প। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ এই শিল্পের চর্চা করে আসছে। কাঠ, পাথর, লোহা ও তামার মতো ধাতুগুলোকে কেন্দ্র করে এই শিল্পের বিকাশ ঘটেছে।
তবে সবচেয়ে সহজলভ্য উপাদান হিসেবে খোদাইশিল্পের প্রধান উপাদান কাঠ। তাই খোদাইশিল্প বলতে সাধারণত কাঠখোদাই শিল্পকেই বোঝায়। ইসলাম তার মূলনীতির আলোকে অন্যান্য শিল্পের মতো খোদাইশিল্পকেও আত্মস্থ করেছে এবং ইসলামের প্রাথমিক যুগেই মুসলিম সমাজে এর চর্চা শুরু হয়েছে। পৃথিবীর প্রায় সব অঞ্চলের মুসলমানদের ভেতর খোদাইশিল্পের চর্চা দেখা যায়।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, মুসলিম বিশ্বের বহু অঞ্চলে কাঠ তুলনামূলকভাবে দুষ্প্রাপ্য, যেমন- আরব উপদ্বীপ এবং মরুপ্রধান আফ্রিকা অঞ্চল; তবু খোদাইশিল্প মুসলিম সমাজে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে। ইসলামী শিল্প ও স্থাপত্য নির্মাণে খোদাইশিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল ও মাধ্যম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
মুসলিম সমাজে খোদাইশিল্পের একটি স্বতন্ত্র ধারা সৃষ্টি হয়েছে। ইসলামের মূলনীতির আলোকে খোদাইশিল্প থেকে প্রাণীর প্রতিকৃতি, নর-নারীর অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি, মদ-জুয়ার মতো নিষিদ্ধ উপাদানগুলো পরিহার করা হয়েছে। বিপরীতে এতে স্থান পেয়েছে উদ্ভিদজাত মোটিফ, ঐতিহ্যবাহী অলংকরণ, জ্যামিতিক নিখুঁত বিন্যাস কিংবা বিমূর্ত নকশা। মুসলিম সমাজে খোদাইশিল্পে শিল্পীর উদ্ভাবনী প্রতিভা, কাজের দক্ষতার পাশাপাশি উপাদানের নানামুখী ব্যবহার ও প্রয়োগ দেখা যায়।
শিল্পকলায় মুসলমানরা রোমান ও পারস্যের মতো প্রাচীন সভ্যতার একটি সমৃদ্ধ ভাণ্ডার লাভ করেছিল। আরব মুসলিমরা এই ভাণ্ডারের অবমূল্যায়ন না করে উন্নয়নে আত্মনিয়োগ করেছিল। উমাইয়া খেলাফতের আমলে মুসলিম বিশ্বে খোদাইশিল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল। দামেস্কের উমাইয়া মসজিদ ও আল আকসা কমপ্লেক্সে তার খণ্ড খণ্ড নিদর্শন আজও বিদ্যমান। তবে মুসলিম সভ্যতা খোদাইশিল্পের স্বর্ণযুগ এসেছিল আব্বাসীয় খেলাফতের সময়। মুসলিম খোদাইশিল্পের প্রাচীনতম নিদর্শনগুলো এই আমলেই নির্মিত হয়।
আব্বাসীয় আমলের একটি নান্দনিক খোদাইশিল্প তিউনিশিয়ার কারাভিন মসজিদে সংরক্ষিত কাঠের মিম্বার। আগলাবীয় রাজবংশের কোনো একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি হিজরি তৃতীয় শতকে (নবম খ্রিস্টাব্দে) মিম্বারটি বাগদাদ থেকে নির্মাণ করিয়ে এনেছিলেন। জ্যামিতিক মোটিফ ও নকশার নিখুঁত কারুকাজ সংবলিত মিম্বারটি খলিফা হারুনর রশিদের আমলে নির্মিত বলে ধারণা করা হয়। খোদাইশিল্পের বিস্ময়কর এই নিদর্শন এখনো সমকালীন বিমূর্ত শিল্পের জন্য অনুপ্রেরণা। উন্নত নকশা ও বিন্যাস শিল্পকর্মটিকে এখনো প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে।
আব্বাসীয় আমলে মুসলিম খোদাইশিল্পীরা রোমান ও পারস্য আমলের প্রভাব কাটিয়ে স্বতন্ত্র ধারা সৃষ্টি করে। আর তুলুনীয় শাসন আমলে মিসরের খোদাইশিল্পীরা আব্বাসীয় ধারাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। এই সময় শাম ও মিসরে এই ধারা ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। মিসরীয় শিল্পীরা আব্বাসীয় ধারাকে আরো পরিমার্জন করে এবং খ্রিস্টীয় দশম শতকের মধ্যে তারা একে স্বতন্ত্র শৈল্পিক রূপ দেয়।
খোদাইয়ের গভীরতা ও গোলাকৃতি তাদের কাজের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য, এটা মিসরীয় শিল্পীদের সৃজনশীলতারও প্রমাণ। মূলত হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতার দেশ মিসর সমৃদ্ধ কারুশিল্প ও শিল্প ঐতিহ্যের ধারক, যা শিল্পীদের মধ্যে খোদাইশিল্পের বিকাশ ও তাদের উচ্চতর দক্ষতা অর্জনে সহায়ক ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মুসলিম বিশ্বের খোদাইশিল্পে জ্যামিতিক নকশার পরিবর্তে বিভিন্ন ধরনের অলংকরণ শুরু হয়। যেমন- প্রাণীর সূক্ষ্ম খোদাই ও আরাবেস্ক স্ক্রল। এসবে শিল্পীদের কাজের সূক্ষ্মতা, উচ্চতর দক্ষতা ও গভীর মনোযোগ স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
ফাতেমীয় শাসকদের সময় খোদাইশিল্পের আরো অগ্রগতি ঘটে। তবে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের পরিপন্থী কিছু বিষয় তাতে যুক্ত হয়। যেমন- প্রাচীন মিসরীয়দের অনুকরণে বিভিন্ন প্রাণীর প্রতীকী ব্যবহার। আইয়ুবীয় যুগের খোদাইশিল্পে দুটি বড় পরিবর্তন দেখা যায় : ক. আরাবেস্ক স্ক্রলের আরো জটিল ব্যবহার, খ. কুফি লিপির পরিবর্তে নাসখ লিপির ব্যবহার। দীর্ঘ সময় মিসরীয় শিল্পীরা খোদাইশিল্পে মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব দিলেও খ্রিস্টীয় ১৫ শতকের পর তাদের অবক্ষয় শুরু হয়।
খ্রিস্টীয় দশম শতক থেকে ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত মধ্য এশিয়া, ইরান ও আফগানিস্তানের খোদাইশিল্পীদের দক্ষতা মিসরীয় খোদাইশিল্পীদের সমতুল্য ছিল। আগ্রা জাদুঘরে সুলতান মাহমুদ গজনভি (রহ.)-এর সমাধির একটি দরজা সংরক্ষিত আছে। এই শিল্পকর্ম থেকে অত্র অঞ্চলের শিল্পীদের প্রতিভা, শৈলী ও কৌশলের ধারণা পাওয়া যায়। এই শিল্পকর্মের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো গভীর খোদাই ও বহুস্তরীয় পৃষ্ঠ ব্যবহার।
সুপ্রাচীন কাল থেকে মালয় সমাজে খোদাইশিল্পের ধারাবাহিক চর্চা ছিল। খোদাইশিল্প মালয় সমাজ ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই অঞ্চলে ইসলাম আগমনের পর খোদাইশিল্পে দুটি মৌলিক সংযোজন ঘটে। তা হলো- ১. আরবি ক্যালিগ্রাফির সংযোজন, যাতে সাধারণত কোরআনের আয়াত, হাদিস ও মুসলিম মনীষীদের বাণী উত্কীর্ণ হতো, ২. মালয় মোটিফের সঙ্গে ইসলামিক মোটিফের সমন্বয়। যেমন- উদ্ভিদভিত্তিক মালয় মোটিফের সঙ্গে আরাবেস্ক স্ক্রলের সুষম সমন্বয়।
আন্দালুস বা মুসলিম স্পেনের শিল্পীরা খোদাইশিল্পকে বহুমাত্রিক রূপ দেয়। তারা খোদাইয়ের জন্য নানা ধরনের উপাদান ও পদ্ধতি ব্যবহার করত। আন্দালুসীয় খোদাইশিল্পের সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণ হলো খোদাই ও ছাঁচে তৈরি প্লাস্টার বা দেয়াল-প্রলপ, যা কঠিন দেয়াল ও গম্বুজকে লেসের মতো সূক্ষ্ম ক্যানভাসে রূপান্তরিত করত। গ্রানাডার নাসরিদ শাসকদের আমলে ১৪ শতকে নির্মিত আলহামরার দেয়াল ও ছাদে এই কাজের সর্বোত্তম নমুনা বিদ্যমান।
আন্দালুসীয় খোদাইশিল্পীরা পাথর খোদাই করে সূক্ষ্ম কারুকাজ করত। কর্ডোভায় অবস্থিত উমাইয়া প্রাসাদ মাদিনাত আল জাহরার ধ্বংসাশেষে কারুকাজ সংবলিত পাথরের স্তম্ভ রয়েছে। এতে মুসলিম শিল্পশৈলীর সঙ্গে প্রাচীন ও ধ্রুপদি যুগের শৈলীর অপূর্ব মিশ্রণ দেখা যায়। এতে পাতা, ফুল, স্ক্রল, বেণির মতো নকশা এবং আরাবেস্ক মোটিফ খোদিত হয়েছে। মুসলিম স্পেনের শিল্পীরা আফ্রিকা থেকে আমদানি করা হাতির দাঁতেও অত্যন্ত গভীর ও সূক্ষ্ম খোদাইকর্ম করত। ৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত মাদিনাত আল জাহরার একটি হাতির দাঁতের ছোট বাক্সে পাতার নকশা, লতা ও ফুলের অপূর্ব সূক্ষ্ম অলংকরণ রয়েছে, যাতে ঢাকনার চারপাশ ঘিরে আরবি ক্যালিগ্রাফির বন্ধন আছে।
ভারতবর্ষের মোগল শাসকরা মূলত পারস্য শিল্পরীতির ধারক ও পৃষ্ঠপোষক ছিল। অবশ্য তারা পারস্যরীতির সঙ্গে ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী ধারার সংমিশ্রণে আগ্রহী ছিল। খোদাইশিল্পেও তাদের এই রীতির প্রভাব দেখা যায়। ভারতবর্ষ জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মোগল স্থাপত্য ও শিল্পকর্ম তার উত্কৃষ্ট উদাহরণ। মোগল আমলে খোদাইশিল্পের অন্যতম প্রধান উপকরণ ছিল জেড পাথর। সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে জেড পাথরে খোদাইশিল্পের বিকাশ ঘটে। জেড পাথর ব্যবহার করা হতো বিভিন্ন ধরনের বস্তু তৈরিতে। যেমন- পাত্র, অস্ত্রের অলংকার ও ব্যক্তিগত অলংকারসামগ্রী। মোগল জেড পাথরের নিদর্শনগুলো তাদের সূক্ষ্ম কারিগরি দক্ষতার জন্য বিখ্যাত।
তথ্যঋণ : মিউজিয়াম ভলেন্টিয়ার্স জেএমএম ডটকম, ক্রাউন মিউমিয়াম ডটঅর্গ ও সিটিজ অব লাইটস।
বিডি-প্রতিদিন