আত্মশুদ্ধির আলোচনা
হাফেজ মাওলানা আল আমিন সরকার
মানবজীবনের সাফল্য আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনে মানবজীবনের সাফল্য ও ব্যর্থতার মাপকাঠি সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছেন। দুনিয়ার ধনসম্পদ, ক্ষমতা, খ্যাতি কিংবা বাহ্যিক অর্জন আল্লাহর কাছে সফলতার মানদণ্ড নয়। বরং সফলতা নির্ধারিত হয় মানুষের নফস ও অন্তরের পরিশুদ্ধিতার ওপর। আল্লাহতায়ালা সুরা শামসে সফলতা-ব্যর্থতার মানদণ্ড স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন। ‘নিশ্চয়ই সে সফল হয়েছে, যে নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেছে। আর সে ব্যর্থ হয়েছে, যে তাকে কলুষিত করেছে।’ (সুরা শামস, আয়াত ৯১০)।
আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) তাফসির কোরআনুল আজিমে এ আয়াতাইনে কারিমাইনের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে নিজের নফসকে পবিত্র করেছে, সে-ই সফল হয়েছে। আর যে ব্যক্তি গুনাহ ও অবাধ্যতার মাধ্যমে নফসকে ধ্বংস করেছে, সে-ই ব্যর্থ হয়েছে। এ সত্যকে মানুষের অন্তরে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য আল্লাহতায়ালা সুরা শামসে একের পর এক মোট ১১টি বিষয়ের কসম করেছেন, সূর্য, চন্দ্র, দিন, রাত, আকাশ, পৃথিবী এবং মানুষের নফসের। এর উদ্দেশ্য একটাই মানুষ যেন উপলব্ধি করে, নফসের পরিশুদ্ধি কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়; এটি জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
বিখ্যাত মনীষী শেখ সাদি (রহ.) পরিশুদ্ধ নফসের আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, বিশুদ্ধ নফস হলো ওই নফস যে নফসে আম্মারার অনুসরণ করো না। অর্থাৎ নফস যে কাজে টানে যদি তা আল্লাহর হুকুমের বিরুদ্ধে হয়, তবে বুঝে নিতে হবে সেটাই মন্দ কাজ। সে কাজ পরিত্যাগ করাই হলো ইসলাহে নফস, আর এই চেষ্টার নামই তাজকিয়া বা আত্মশুদ্ধি।
মনে রাখতে হবে নফস একটিই। উলামায়ে কেরামের সর্বসম্মত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কর্মগুণে নফস তিন স্তরের হয়ে থাকে। ১. নফসে আম্মারাহ বা মন্দ কাজে প্ররোচনাকারী নফস। ২. নফসে লাউওয়ামাহ বা গুনাহের কারণে নিজেকে তিরস্কারকারী নফস এবং নফসে মুতমাইন্নাহ বা নেক আমলে প্রশান্ত নফস। এই তিন প্রকার নফসের আলোচনা আল কোরআনে এসেছে। প্রথম প্রকার নফস সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই নফস মন্দ কাজের নির্দেশ দেয়।’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত ৫৩) দ্বিতীয় প্রকার নফসের উল্লেখ রয়েছ সুরা কেয়ামায়।, ‘আমি শপথ করি কিয়ামাহ দিবসের আরও শপথ করি সেই মনের, যে নিজেকে ধিক্কার দেয় ( সুরা কিয়ামাহ : ১-২)।
তাফসিরে মারেফুল কোরআনে নফসে লাওয়ামাহ সম্পর্কে বলা হয়েছে, নফসে লাওয়ামাহ এমন একটি নফস, যে নিজের কাজকর্মের হিসাব নিয়ে নিজেকে ধিক্কার দেয়। অর্থাৎ কৃত গুনাহ অথবা ওয়াজিবকর্মে ত্রুটির কারণে নিজেকে ভর্ৎসনা করে। সৎকর্ম সম্পর্কেও নিজেকে এই বলে তিরস্কার করে যে আরও বেশি সৎকাজ সম্পাদন করে উচ্চমর্যাদা লাভ করলে না কেন? হজরত হাসান বসরি (রাহ.) নফসে লাওয়ামাহ-এর তাফসির করেছেন, ‘নফসে মুমিনা’। তিনি বলেন, আল্লাহর কসম! মুমিন তো নিজেকে সর্বদা সর্বাবস্থায় ধিক্কায় দেয়। সৎকর্মসমূহেও সে আল্লাহর শানের মোকাবিলায় আপন কর্মে অভাব ও ত্রুটি অনুভব করে। কেননা আল্লাহর হক পুরোপুরি আদায় করা সাধ্যাতীত ব্যাপার। ফলে তার দৃষ্টিতে ত্রুটি থাকে এবং তার জন্য নিজেকে ধিক্কার দেয়।
তৃতীয় প্রকার নফসের আলোচনা এসেছে সুরা ফজরে। আল্লাহ বলেন, হে প্রশান্ত আত্মা! তুমি তোমার পালনকর্তার কাছে ফিরে যাও সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে। অতঃপর আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও। এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ কর।’ (সুরা ফজর : ২৭-৩০)। তাফসিরে মারেফুল কোরআনে নফসে মুতামায়িন্নাহ সম্পর্কে বলা হয়েছে, এ আত্মা আল্লাহর প্রতি তার সৃষ্টিগত ও আইনগত বিধিবিধানে সন্তুষ্ট এবং আল্লাহও তার প্রতি সন্তুষ্ট। মহান রাব্বুল আলামিন এসব প্রশান্ত আত্মাকে সম্বোধন করে বলেন, আমার বিশেষ বান্দাদের কাতারভুক্ত হয়ে যাও এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ কর। ধারাবাহিক সাধনা ও আত্মসংযমের মাধ্যমে এই আম্মারাহ নফসই ধীরে ধীরে লাউওয়ামাহ, তারপর মুতমাইন্নাহতে রূপান্তরিত হয়।
পৃথিবীর বুকে নবী প্রেরণের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো মানুষের নফস পরিশুদ্ধ করা। আল্লাহতায়ালা সুরা আলে ইমরানের ১৬৪ আয়াতে নবীর অন্যতম কাজ হিসেবে তাজকিয়া বা আত্মশুদ্ধির উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘নবীর অন্যতম কাজ হলো ইউজাক্কিহিম বা রসুল তাদের আত্মশুদ্ধি করেন।’ অর্থাৎ অন্তরের রোগ দূর করে উত্তম গুণাবলি স্থাপন করেন। এটি আমাদের ওপর আল্লাহতায়ালার বিশেষ ইহসান যে আমাদের নফসকে ইসলাহ করে দেওয়া, পাক-সাফ করে দেওয়ার দায়িত্ব তিনি তাঁর প্রিয় নবীর ওপর ন্যস্ত করেছেন।
লেখক : প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল, চরপাথালিয়া সালমান ফারসি (রা.) মাদ্রাসা, গজারিয়া, মুন্সিগঞ্জ
বিডি-প্রতিদিন/