• সিলেট, বিকাল ৪:৪৬, ১৮ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ইসলামের দৃষ্টিতে বন্ধুত্ব

admin
প্রকাশিত এপ্রিল ২৮, ২০২৬
ইসলামের দৃষ্টিতে বন্ধুত্ব

Manual1 Ad Code

ইসলামের দৃষ্টিতে বন্ধুত্ব ও বিরোধের মানদন্ড

মুফতি রফিকুল ইসলাম আল মাদানি

 

Manual6 Ad Code

মানুষ সামাজিক জীব। সমাজে চলতে গেলে বন্ধুত্ব, ভালোবাসা এবং কখনো কখনো মতবিরোধ- এসবই মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে ইসলাম শুধু আবেগ বা স্বার্থের ভিত্তিতে মানুষের সম্পর্ক নির্ধারণকে সমর্থন করে না। অনুমোদন দেয় না শুধু বিরোধের স্বার্থে ঝগড়াবিবাদ ও বাড়াবাড়িকে। বরং ইমান, নৈতিকতা ও আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সম্পর্কের মূল মানদন্ড হিসেবে নির্ধারণ করেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত বন্ধুত্ব সেই বন্ধুত্ব, যা মানুষের ইমানকে শক্তিশালী করে এবং তাকে সৎ পথে পরিচালিত করে।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা মানুষের বন্ধুত্ব ও বিরোধের ক্ষেত্রে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। ঘোষণা করেছেন, ‘মুমিনগণ পরস্পরের বন্ধু ও সহায়ক; তারা সৎকাজের আদেশ দেয় এবং অসৎকাজ থেকে বিরত রাখে (সুরা তাওবা : ৭১)।’ ইসলামে বন্ধুত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মানদন্ড হলো তাকওয়া বা আল্লাহভীতি। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘সেদিন (কিয়ামতের দিন) বন্ধুরা পরস্পরের শত্রু হয়ে যাবে, তবে মুত্তাকিরা (আল্লাহভীরু লোকেরা) ব্যতীত (সুরা যুখরুফ : ৬৭)।’

রসুলুল্লাহ (সা.) বন্ধুত্বের প্রভাব সম্পর্কে অত্যন্ত সুন্দর একটি দৃষ্টান্ত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘ভালো সঙ্গী এবং খারাপ সঙ্গীর উদাহরণ হলো সুগন্ধি বিক্রেতা ও কামারের মতো। সুগন্ধি বিক্রেতার কাছে গেলে হয়তো তুমি সুগন্ধি পাবে বা অন্তত সুগন্ধ অনুভব করবে; আর কামারের কাছে গেলে হয়তো আগুনের স্ফুলিঙ্গে তোমার কাপড় পুড়ে যাবে অথবা দুর্গন্ধে কষ্ট পাবে (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)।’

অন্যদিকে ইসলামে বিরোধ বা শত্রুতার ক্ষেত্রেও একটি ন্যায়সংগত ও ভারসাম্যপূর্ণ মানদন্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। ইসলাম অকারণে কারও প্রতি ঘৃণা বা শত্রুতা পোষণ করতে নিষেধ করে। কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি তোমাদের বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার থেকে বিরত না রাখে; তোমরা ন্যায়বিচার কর, এটিই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী (সুরা মায়েদা : ৮)।’

তাই অকারণে বিরোধিতা করা অন্যায় ও অনৈতিক আচরণ হিসেবে গণ্য হয়। এ ধরনের বিরোধিতার বেশ কিছু ক্ষতিকর দিক রয়েছে। প্রথমত এটি সমাজে বিভেদ, শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করে। দ্বিতীয়ত সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে অহংকার ও স্বার্থপরতা বৃদ্ধি করে। তৃতীয়ত পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট করে এবং সমাজে শান্তি ও ঐক্য দুর্বল করে।
সুতরাং ইসলামের শিক্ষা হলো-বিরোধিতা যদি হয়, তা হবে সত্য ও ন্যায়ের জন্য; কিন্তু অহেতুক বা ব্যক্তিগত স্বার্থে বিরোধিতা করা ইসলামি নৈতিকতার পরিপন্থি। এজন্য কোনো মুসলমান সব ক্ষেত্রে কারও বিরোধী হতে পারে না। বিরোধের ক্ষেত্রে বিরোধ হবে, আর সহযোগিতার ক্ষেত্রে হবে সহযোগী।

ইসলাম শত্রুতাকে স্থায়ী করে রাখতেও উৎসাহ দেয় না। বরং ক্ষমা, সহনশীলতা ও সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রতি জোর দেয়। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলমানের জন্য বৈধ নয় যে সে তার ভাইয়ের সঙ্গে তিন দিনের বেশি সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন রাখবে (সহিহ বুখারি)।’

তাই সাময়িক মতবিরোধ হতে পারে, কিন্তু তা দীর্ঘস্থায়ী করা ইসলামের আদর্শ নয়। ইসলামের ইতিহাসে আমরা দেখি, সাহাবায়ে কেরামদের মধ্যে মতবিরোধ হয়েছে, কিন্তু তাঁদের হৃদয়ে ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। তাঁরা মতের পার্থক্যকে ব্যক্তিগত শত্রুতায় রূপ দেননি। এই শিক্ষাই আজকের মুসলিম সমাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেন, ‘মানুষ যার সঙ্গে ভালোবাসা রাখে, কিয়ামতের দিন সে তার সঙ্গেই থাকবে (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)।’ তাই মানুষের উচিত নেককার ও সৎ মানুষের প্রতি ভালোবাসা রাখা এবং খারাপ লোকদের সঙ্গ থেকে দূরে থাকা।

অপর এক হাদিসে এমন সাত ধরনের সৌভাগ্যবান মানুষের কথা বলা হয়েছে যারা কিয়ামতের কঠিন দিনে আল্লাহর বিশেষ রহমত ও নিরাপত্তা লাভ করবে। তাদের একজন হলো, ‘এমন দুই ব্যক্তি যারা আল্লাহর জন্য পরস্পরকে ভালোবাসে-তারা আল্লাহর জন্যই মিলিত হয় এবং আল্লাহর জন্যই পৃথক হয় (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)।’

বর্তমান যুগে আমরা প্রায়ই দেখি বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে স্বার্থ, অর্থ, ক্ষমতা বা সাময়িক আনন্দের ওপর ভিত্তি করে। আবার সামান্য মতপার্থক্যেই মানুষ চরম শত্রুতায় জড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই প্রবণতা আরও তীব্র হয়েছে। অথচ ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয়-বন্ধুত্ব হবে নৈতিকতার ওপর এবং বিরোধ হবে ন্যায় ও সত্যের ভিত্তিতে।

সুতরাং ইসলামের দৃষ্টিতে বন্ধুত্ব ও বিরোধের মূল মানদন্ড হলো ইমান, ন্যায়বিচার, তাকওয়া এবং মানবিকতা। যে বন্ধুত্ব মানুষকে আল্লাহর পথে এগিয়ে দেয়, সেটিই প্রকৃত বন্ধুত্ব; আর যে বিরোধ মানুষকে অন্যায় ও অবিচারের দিকে ঠেলে দেয়, তা ইসলাম সমর্থন করে না। প্রত্যেক মুসলমানের উচিত মানবিক সম্পর্কের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সর্বাগ্রে রাখা। তবেই সমাজে সত্যিকারার্থে শান্তি, ন্যায় ও সৌহার্দ প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

লেখক : গবেষক, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরা, ঢাকা।

Manual5 Ad Code

 

Manual5 Ad Code

 

বিডি-প্রতিদিন

Manual6 Ad Code

Latif Travels
Metropolitan University

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন

📞 মোবাইল: +8801712540420

✉️ ইমেইল: pavel.syl@gmail.com