মুমিনের আত্মায় ঝরে তওবার বৃষ্টি
মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী
প্রকৃতিতে বর্ষা আসে মন কাঁদানোর জন্য। মন কাঁদলেই মানুষ ফিরতে চায়। সবাই ফিরতে পারে না। নানা কারণেই পারে না। সব সময় দরজা খোলা থাকে না। ফেরার পরিস্থিতিও সব সময় থাকে না। প্রকৃত প্রেমিক সব সময় দরজা খোলা রাখে। তাই তো কবি বর্ষার আবেদন তুলে ধরেছেন এভাবে-‘যদি মন কাঁদে, তুমি চলে এসো এক বরষায়।’ বর্ষা মন কাঁদানোর ঋতু। বর্ষা প্রেম নবায়নের ঋতু। বর্ষা প্রেমিকের কাছে ফেরার ঋতু। বর্ষা প্রেমে পড়ার ঋতু। বর্ষা মানুষ হওয়ার ঋতু। দীর্ঘ খরতাপে পোড়ার পর বর্ষা এসে প্রকৃতিকে ভিজিয়ে দেয়। ধুয়েমুছে সাফ করে দেয় সব ময়লা-আবর্জনা। তখন সবকিছু নতুন মনে হয়। নতুন মন ফিরতে চায় প্রেমের কাছে। বৈষয়িক জঞ্জাল জীবন নয় এটা সে বুঝতে পারে। বুঝতে পারে জীবনে প্রেমই সব। প্রেম ছাড়া আর যা আছে সব তুচ্ছ বিষয়। পৃথিবীতে প্রেমই অমর। পৃথিবীতে প্রেমই মকবুল। প্রেমহীন কিছু পৃথিবীতে টেকে না। প্রেমহীন এবাদত মাবুদের দরবারে কবুল হয় না। যেখানে প্রেম নেই সেখানে রহমত নেই। যেখানে প্রেম নেই সেখানে কল্যাণ নেই। যেখানে প্রেম নেই সেখানে স্বার্থ লুকিয়ে থাকে হিংস্ররূপে। যে সমাজে প্রেম নেই সেখানে মানুষ মানুষকে মেরে ফেলে প্রস্তর দিয়ে থেঁতলে থেঁতলে। আমাদের মতো অসভ্য জাতিকে আবার সভ্যতার সবক দিতে আল্লাহ প্রকৃতিতে পাঠিয়েছেন বর্ষা। প্রেমহীন এই স্বার্থবাদী সমাজকে প্রেমময় নিঃস্বার্থ করে তুলতে আবার এসেছে বরষা। এসেছে নতুন ভরসা। বর্ষা প্রেমের ঋতু। বর্ষা প্রেম নবায়নের ঋতু। দিনভর ঝিরিঝিরি বৃষ্টির সঙ্গে মিহি মিহি প্রেমও ঝরে পৃথিবীর আনাচকানাচে। রাতের নীরবতা ভেঙে করুণ সুরে ঝুম বর্ষণের সঙ্গে তুমুল প্রেম নামে খোদার রহমত হয়ে। সে রহমতে যে নিজেকে ভেজাতে পারে সেই ফিরতে পারে। ফিরতে পারে প্রেমের কাছে। মানুষের কাছে। মানবতার কাছে। এভাবে একটা সময় প্রেমের রশি ধরে সে পৌঁছে যায় আল্লাহর কাছে। হয়ে ওঠেন আল্লাহর অলি। অলি হওয়ার প্রথম শর্তই প্রেম। মুমিন হওয়ার প্রথম শর্তও প্রেম। প্রেম ছাড়া মুসলমান হওয়া যায় না। প্রেম ছাড়া মানুষ হওয়া যায় না। যার হৃদয়ে প্রেম নেই, মমতা নেই, মানুষের জন্য মায়া নেই- কোরআনের ভাষায় তাকে চতুষ্পদ জানোয়ারের চেয়েও অধম বলা হয়েছে। চতুষ্পদ জন্তুর ভিতরও প্রেম আছে। মমতা আছে। মানুষ যখন প্রেম ভুলে যায় তখন সে সাপের চেয়েও বিষাক্ত, নেকড়ের চেয়েও হিংস্র আর শিয়ালের চেয়েও ধূর্ত হয়ে ওঠে। প্রেমহীন মানুষকে এক শব্দে অমানুষ বলা হলেও যে মানুষের ভিতর সব পশুর হিংস্রতা একসঙ্গে জমা হয় সেই সত্যিকারের অমানুষ।
আরবিতে মানুষ শব্দের প্রতিশব্দ হলো ইনসান। আলিফ-নুন ও সিন এ তিন হরফে গঠিত উনুস শব্দ থেকে এসেছে ইনসান। উনুস মানে হলো প্রেমপ্রীতি-মায়ামমতা-ভালোবাসা। মানুষের বড় পরিচয় প্রেম। পশুর বড় পরিচয় কাম। মানুষ যেভাবে প্রেম বিলাতে পারে সৃষ্টিজগতে আর কোনো সৃষ্টি সেভাবে প্রেম বিলানোর ক্ষমতা রাখে না। মানুষ যখন প্রেম ভুলে কামে অন্ধ হয়ে যায়, স্বার্থের গোলাম হয়ে যায় তখন সে দেখতে মানুষের মতো হলেও আসলে সে নিরেট একটা পশুতে পরিণত হয়। আজ বাংলাদেশের মানুষের দিকে তাকালে প্রেমিক পাওয়া যায় না। সর্বত্রই স্বার্থ। অর্থ। ধান্দা। যেভাবে পারো মানুষ ঠকাও। নিজের গদি নিশ্চিত করো। আখের গোছাও। ব্যাংক ব্যালান্স হৃষ্ট করো। এই আমাদের চরিত্র হয়ে গেছে। যে কারণে ফুটপাতের হকারি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের বড় বড় কাজ এখন চাঁদাবাজি আর ঘুষখোরদের আস্তিনে। দুনিয়াপাগল মানুষগুলো ভুলে গেছে আল্লাহর কথা। ভুলে গেছে তার প্রথম পরিচয় প্রেমের কথা। আমাদের সমাজে এখন আর প্রেম নেই। প্রেমের মোড়কে বিক্রি হচ্ছে কাম। ভালোবাসার ঠোঙায় পাওয়া যাচ্ছে স্বার্থ। যুবকযুবতীর অবৈধ প্রেম, পরকীয়া, অসম প্রেম, সমকামী প্রেম-এ ধরনের শব্দের প্রচলন ঘটেছে এসব কারণেই। অথচ অবৈধ প্রেম বলে কিছু নেই। যা কিছু অবৈধ, যা কিছু নোংরা, কুৎসিত, হিংস্র, অসামাজিক, অশ্লীল তার সঙ্গে প্রেমের কোনো সম্পর্ক নেই। প্রেম মানুষের আত্মপরিচয়ের প্রথম সবক।
দীর্ঘ খরায় প্রকৃতি যেমন রুক্ষ হয়ে পড়ে, তেমনি স্বার্থ আর সংঘাতের দ্বন্দ্বেও মানুষের কলব হয়ে যায় শুষ্ক। প্রেমহীন শুষ্ক কলব সিক্ত করার জন্য চাই বৃষ্টি। প্রেমের বৃষ্টি। রহমতের বর্ষণ। যুগে যুগে নবীরা এসেছেন জগতের শুষ্ক আত্মাগুলোকে খোদার রহমতে সিক্ত করতে। বর্ষায় প্রকৃতি যেমন ভিজে নতুন হয়ে ওঠে তেমনি মানব আত্মাও রহমতের বৃষ্টিতে ধুয়েমুছে পরিষ্কার করে নিতে হয়। আর এজন্য ফিরতে হয় মাবুদের কোলে। এ ফিরে আসাকেই কোরআনে তওবা বলা হয়েছে। তওবা মানে ফিরে আসা। পাপে তাপে বিধ্বস্ত আত্মা যখন স্বার্থের ঠুলি খুলে বাস্তবতায় এসে দাঁড়ায়, তখন সে দেখে আল্লাহ ছাড়া তার কেউ নেই। সে ভাবে এত পাপ-পঙ্কিলতা ভরা জীবন কি আল্লাহ ধুয়ে দেবেন রহমতের বর্ষণে? সে আশার বাণীই শোনা যায় কবিতায়- যদি মন কাঁদে, চলে এসো এক বরষায়। প্রকৃতিতে বর্ষার নির্দিষ্ট ঋতু থাকলেও আল্লাহর কাছে বারো মাসই বর্ষা। বান্দার যখন মন কাঁদবে, তখনই আল্লাহ তাকে কোলে তুলে নেবেন পরম মমতায়। আল্লাহ আমাদের কবুল করুন। আমিন।
♦ লেখক : প্রিন্সিপাল, সেইফ এডুকেশন ইনস্টিটিউট
বিডি-প্রতিদিন