এআই নির্মিত ছবি
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি: যা আছে ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকে
অনলাইন ডেস্ক
দীর্ঘ তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের অবসানের লক্ষ্যে সমঝোতায় পৌঁছেছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। গত রবিবার চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছে উভয়পক্ষ। আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের মাধ্যমে তা কার্যকর হবে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশই ইতোমধ্যে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
প্রস্তাবিত ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকে যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালীর নৌ চলাচল পুনরায় চালু, ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল, অর্থনৈতিক সহায়তা এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনার কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের হাতে পাওয়া নথি অনুযায়ী, এই সমঝোতায় দুই দেশ একে অপরের বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক পদক্ষেপ বন্ধ করার পাশাপাশি ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে আলোচনা চালানোর বিষয়ে সম্মত হয়েছে।
তবে নথিটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। সিএনএন জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তার কাছ থেকে নথিটির একটি কপি পেয়েছে। ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি৭ সম্মেলনে উপস্থিত এক কূটনীতিক এবং আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও দুই কূটনৈতিক সূত্র নথির বিষয়বস্তু নিশ্চিত করেছে।
নথি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য রফতানির সুযোগ পুনরায় চালু করতে পারে। পাশাপাশি পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে প্রতিশ্রুতি পূরণ করলে ইরান প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি উন্নয়ন তহবিলে প্রবেশাধিকার পেতে পারে। তবে ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তারিত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত চুক্তির জন্য রাখা হয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা অবশ্য সমঝোতা স্মারকটিকে একটি ‘রাজনৈতিক নথি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাদের দাবি, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু গোপন কূটনৈতিক সমঝোতা এতে অন্তর্ভুক্ত নেই।
অন্যদিকে ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, প্রকাশিত খসড়া নথির কিছু তথ্য সঠিক নয়।
নথিতে উল্লেখিত ১৪টি মূল ধারা হলো—
১. যুদ্ধের অবসান ও শত্রুতা বন্ধ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এবং তাদের সংশ্লিষ্ট মিত্ররা এই সমঝোতা স্বাক্ষরের পরপরই সব ফ্রন্টে যুদ্ধের অবসান ঘোষণা করবে। ভবিষ্যতে তারা একে অপরের বিরুদ্ধে কোনও ধরনের হামলা বা শক্তি প্রয়োগের হুমকি দেবে না।
২. সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান
দুই দেশ একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান দেখাবে এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকবে।
৩. ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি
দুই পক্ষ সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য আলোচনা করবে। প্রয়োজন হলে পারস্পরিক সম্মতিতে সময় বাড়ানো যেতে পারে।
৪. নৌ অবরোধ প্রত্যাহার ও মার্কিন বাহিনী সরানো
সমঝোতা স্বাক্ষরের পর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে এবং সর্বোচ্চ ৩০ দিনের মধ্যে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে আনবে। চূড়ান্ত চুক্তির পর আশপাশের অঞ্চল থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের কথাও বলা হয়েছে।
৫. হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল পুনরায় চালু
ইরান ৩০ দিনের মধ্যে পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর পর্যন্ত বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় চালু করবে। এজন্য প্রযুক্তিগত বাধা দূর এবং সমুদ্রপথে স্থাপিত মাইন নিষ্ক্রিয় করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
৬. ইরানের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে ৩০০ বিলিয়ন ডলার তহবিল
যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক অংশীদাররা ইরানের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য একটি পরিকল্পনা তৈরি করবে, যাতে অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
৭. নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি
চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থাকা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) এবং একতরফা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
৮. পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার ঘোষণা
ইরান পুনরায় ঘোষণা করেছে যে, তারা কখনও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। তবে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামসহ পারমাণবিক ইস্যুগুলোর সমাধান চূড়ান্ত চুক্তিতে নির্ধারণ করা হবে।
৯. আলোচনার সময় বর্তমান অবস্থা বজায় রাখা
চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচিতে বর্তমান অবস্থান বজায় রাখবে এবং যুক্তরাষ্ট্র নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ বা মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শক্তি বাড়াবে না।
১০. ইরানের তেল রফতানির অনুমতি
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আগ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের অপরিশোধিত তেল, পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকিং, বীমা ও পরিবহন কার্যক্রমের জন্য ছাড়পত্র দেবে।
১১. ইরানের জব্দ অর্থ ছাড়ের ব্যবস্থা
আলোচনার অগ্রগতির ভিত্তিতে ইরানের আটকে থাকা অর্থ ও সম্পদ মুক্ত করে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
১২. বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা
চুক্তির বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রতিশ্রুতি পর্যবেক্ষণের জন্য একটি যৌথ ব্যবস্থা গঠন করা হবে।
১৩. চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনা শুরু
সমঝোতার ৪, ৫, ১০ ও ১১ নম্বর ধারা বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা পাওয়ার পর দুই দেশ বাকি বিষয়গুলো নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনা শুরু করবে।
১৪. জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন
চূড়ান্ত চুক্তি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদন করা হবে।
চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর হলে ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে। তবে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস, ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে চূড়ান্ত সমঝোতা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে এখনও আন্তর্জাতিক মহলে সতর্ক দৃষ্টি রয়েছে। সূত্র: সিএনএন
বিডি প্রতিদিন