• সিলেট, রাত ৮:৫২, ২৪শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

হজের তালবিয়া : অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও শিক্ষা

admin
প্রকাশিত মে ২৪, ২০২৬
হজের তালবিয়া : অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও শিক্ষা

Manual6 Ad Code

হজের তালবিয়া : অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও শিক্ষা

মাওলানা মুহাম্মদ মুনিরুল হাছান

Manual5 Ad Code

 

Manual2 Ad Code

হজের তিনটি ফরজের মধ্যে একটি হলো ইহরাম বাঁধা। ইহরাম বাঁধার মাধ্যমে পুরুষ হাজিরা উচ্চৈঃস্বরে তালবিয়া পাঠ করে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে থাকেন।

নারীরা উচ্চারণ করেন চুপে চুপে। এই তালবিয়ার রয়েছে আলাদা এক সম্মোহনী শক্তি। তালবিয়া শুধু কয়েকটি শব্দমালার সমষ্টি নয়। এর গঠনশৈলী যেমন অতুলনীয় তেমনি এর ভাব ও ব্যঞ্জনায় রয়েছে অসাধারণ জাগরণী মনোভাব।

শব্দগুলো অত্যন্ত প্রেরণাদায়ক ও উদ্দীপনাপূর্ণ। হজ পালনকারীরা যখন এই তালবিয়া পাঠ করেন, তখন তাঁরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও আধিপত্যের মহাসমুদ্রে বিলীন হয়ে যান। একটি স্লোগানে দুনিয়ার রাজা-প্রজা, ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, সাদা-কালো সবাই একাকার। তাদের মধ্যে থাকে না কোনো আমিত্ব, বৈষম্য, অহংকার ও সংকীর্ণতা।

তালবিয়া পাঠকারীর চতুর্পাশ থেকেও একই রকম আহবান ভেসে ওঠে। যদিও তা আমরা শুনতে পাই না। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, সাহল ইবনে সাদ (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যখন কোনো মুসলিম তালবিয়া পাঠ করে তখন তার ডানে ও বাঁয়ে পাথর, বৃক্ষরাজি, মাটি—সবকিছু তার সঙ্গে তালবিয়া পাঠ করে। এমনকি পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত (তালবিয়া পাঠকারীদের দ্বারা) পূর্ণ হয়ে যায়।’
(তিরমিজি, হাদিস : ৮২৮, ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৯২১)

হজের ঘোষণা ও তালবিয়া

হজ হলো বিশ্ব মুসলিমের মহাসম্মেলন।

প্রতিবছর হজ পালনের জন্য পৃথিবীর প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আল্লাহর ঘরে লাখো মানুষ হাজির হন। পবিত্র কাবাঘর সর্বপ্রথম নির্মাণ করেন ফেরেশতাগণ। এরপর দ্বিতীয় নির্মাতা হলেন আদম (আ.)। নুহ (আ.)-এর সময়ে মহাপ্লাবনে কাবাঘর নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলে ইবরাহিম (আ.) পুনরায় কাবাঘর নির্মাণ করেন। কাবাঘর নির্মাণ করার পর আল্লাহ তাআলা ইবরাহিম (আ.)-কে বললেন, আপনি মানুষের মধ্যে ঘোষণা করে দিন যে আল্লাহ তোমাদের ওপর হজ ফরজ করেছেন। পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘আর মানুষের কাছে হজের ঘোষণা করে দিন। তারা আপনার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে সব ধরনের কৃষকায় উটের পিঠে করে, তারা আসবে দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রম করে। যাতে তারা তাদের কল্যাণের স্থানগুলোতে উপস্থিত হতে পারে এবং তিনি তাদের চতুষ্পদ জন্তু হতে যা রিজিক হিসেবে দিয়েছেন তার ওপর নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করতে পারে। অতঃপর তোমরা তা থেকে খাও এবং দুস্থ, অভাবগ্রস্তকে আহার করাও।’
(সুরা : হজ, আয়াত : ২৭-২৮)

ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন যে যখন ইবরাহিম (আ.)-কে হজের ঘোষণা দিতে আদেশ দেওয়া হলো, তখন তিনি আল্লাহর কাছে আরজ করলেন—এখানে তো জনমানবহীন প্রান্তর। ঘোষণা শোনার মতো কেউ নেই। আমার আওয়াজ কে শুনবে? জবাবে আল্লাহ তাআলা বললেন, আপনার দায়িত্ব শুধু ঘোষণা করা। বিশ্বে পৌঁছানোর দায়িত্ব আমার। এই নির্দেশ পেয়ে ইবরাহিম (আ.) ‘আবু কুবাইস’ পাহাড়ে আরোহণ করে দুই কানে আঙুল রেখে ডানে-বাঁয়ে এবং পূর্ব-পশ্চিমে মুখ করে ডাক দিলেন, ‘হে লোক সকল! তোমাদের পালনকর্তা গৃহনির্মাণ করেছেন এবং তোমাদের ওপর এই গৃহের হজ ফরজ করেছেন। তোমরা সবাই রবের আদেশ পালন করো।’ অতঃপর ইবরাহিম (আ.)-এর এই আওয়াজ আল্লাহ তাআলা বিশ্বের কোণে কোণে পৌঁছে দেন। এই আহবান শুধু তখনকার জীবিত মানুষই নয়; বরং কিয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ আগমনকারী ছিল তাদের সবার কান পর্যন্ত এ আওয়াজ পৌঁছে দেওয়া হয়। আল্লাহ তাআলা যার যার ভাগ্যে হজ লিখে দিয়েছেন তাদের প্রত্যেকেই এই আওয়াজের জবাবে বলেছিলেন, ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক।’ হাজির, হে আল্লাহ! আমি হাজির।

(তাফসির তাবারি, ১৪/১৪৪)

ইবরাহিম (আ.)-এর আহ্বানের জবাবই হচ্ছে ‘লাব্বাইক’ বা তালবিয়ার মূল ভিত্তি।

তালবিয়ার শব্দ

হজের তালবিয়া হলো—‘লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইক লা-শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নিমাতা লাকা ওয়ালমুলক, লা শারিকা লাক।’ অর্থ : আমি হাজির, হে আল্লাহ! আমি হাজির! আপনার কোনো শরিক নেই, আমি হাজির। নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা, নিয়ামত ও রাজত্ব আপনার। আপনার কোনো শরিক নেই। (বুখারি, হাদিস : ১৫৪৯)

তালবিয়া পাঠের ফজিলত

তালবিয়া দ্বারা হজ ও ওমরাহ পালনকারী ব্যক্তিরা মহান আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার প্রতিজ্ঞা ঘোষণা করেন এবং তার অনুগ্রহ প্রার্থনা করেন। তালবিয়া পাঠ হজ ও ওমরাহর শোভা বৃদ্ধি করে বলে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেন, অমুকের ওপর আল্লাহর অভিশাপ! তারা ইচ্ছা করে হজের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ দিনের শোভা মিটিয়ে দিল। আর নিশ্চয় হজের শোভা হলো তালবিয়া।

(মুসনাদ আহমদ ১/২১৭)

যে হজে উচ্চৈঃস্বরে তালবিয়া পাঠ করা হয় সেটি উত্তম হজ। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, সর্বোত্তম হজ হলো আলআজ্জু ওয়াছছাজ্জু। ‘আলআজ্জু, অর্থ তালবিয়া পাঠ করা এবং ‘ওয়াছছাজ্জু’ অর্থ কোরবানি করা।’

(মুসনাদ আবু ইয়ালা, হাদিস : ৫০৮২)

জাহেলি যুগে তালবিয়া

পবিত্র কাবাঘর নির্মাণের মাধ্যমে মক্কা নগরীতে জনসমাগম বৃদ্ধি পেতে লাগল। কালের পরিক্রমায় জাহেলি যুগের মানুষগুলো আল্লাহর একত্ববাদের কথা ভুলে গিয়ে শয়তানের প্ররোচনায় শিরক ও কুফরিতে লিপ্ত হয়ে যায়। আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগে তারা মিল্লাতে ইবরাহিমির নাম দিয়ে হজ করত। কিন্তু তারা হজের তালবিয়ায় শিরকের কথা মিশিয়ে দিয়েছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তাদের বেশির ভাগ আল্লাহর ওপর ঈমান রাখে, তবে তার সঙ্গে ইবাদতে শিরক করা অবস্থায়।’

(সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ১০৬)

Manual4 Ad Code

তারা বায়তুল্লাহর চারপাশে প্রদক্ষিণকালে বলত, ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইক লা শারিকা লাকা, ইল্লা শারিকান হুয়া লাকা তামলিকুহু ওমা মালাক।’ অর্থাৎ আমি হাজির, আল্লাহ আমি হাজির, আমি হাজির, আপনার কোনো শরিক নেই, তবে এমন এক শরিক আছে যার আপনি মালিক, সে আপনার মালিক নয় ।

(আল-বাগাভি, তাফসির মালিমুত তানজিল)

তালবিয়ার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য

‘লাব্বাইক’-এর অন্য অর্থ হলো, আমি আপনার আনুগত্যে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। হে প্রভু, আমার গন্তব্য আপনার দিকে, আমার উদ্দেশ্য ও কর্মকাণ্ড আপনার আদেশের প্রতি নিবেদিত। অর্থাৎ আমি দুনিয়ার সমস্ত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও জাঁকজমকপূর্ণ জীবন পরিত্যাগ করে আপনার ডাকে সাড়া দিয়েছি। হে প্রভু, আপনিই একমাত্র, আপনার কোনো অংশীদার নেই। হজযাত্রীরা তার নিজের ঘরবাড়ি, দেশ, পরিবার-পরিজন, অর্থ-সম্পদ, পছন্দের পোশাক এবং হালাল অনেক বিষয় পরিত্যাগ করে তাঁরই সন্তুষ্টি অর্জনের পথে ছুটে চলেন। পাশাপাশি তিনি গাছপালা, পশুপাখি এবং অন্যান্য সব সৃষ্টির সঙ্গে উত্তম আচরণ করেন। কারণ ইহরাম অবস্থায় অনেক কিছুই নিষিদ্ধ থাকে। শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য পারস্পরিক তর্ক-বিতর্ক, অশ্লীল কথাবার্তাও পরিহার করে চলেন। সর্বোপরি এই তালবিয়ায় রয়েছে দাসত্বের অঙ্গীকার, প্রভুর কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ, নৈকট্য লাভের উপলব্ধি, একত্ববাদের প্রতীক, ইবরাহিমি মিল্লাতের ধারাবাহিকতা, জান্নাতে প্রবেশের চাবি, একনিষ্ঠতার মহান স্বীকৃতি, আল্লাহর নিয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং এক আল্লাহর প্রতি সাক্ষ্য দেওয়ার ঘোষণা।

সব ধরনের শিরক থেকে মুক্তির ঘোষণা

তালবিয়ায় ‘লা-শারিকা লাক’ শব্দটি আছে দুবার। এ হচ্ছে সব ধরনের শিরক বর্জনের ঘোষণা। আনুগত্যে, ইবাদতে, প্রার্থনায় এবং অন্য যেকোনো বিষয়েই আল্লাহর কোনো শরিক নেই। তিনি লা-শরিক, তিনি একক ও অনাদি সত্তা। পৃথিবীতে সব ধরনের জুলুমের মধ্যে সবচেয়ে বড় জুলুম হলো শিরক। শিরক হলো মহান আল্লাহর সঙ্গে কোনো ব্যক্তি বা বস্তুকে শরিক করা কিংবা তাঁর সমতুল্য মনে করা। হজে গমন করে বারবার তালবিয়া পাঠের মাধ্যমে আদম সন্তান যাবতীয় শিরক থেকে বিমুখতার ঘোষণা দিয়ে বলে থাকেন, ‘লাব্বাইক লা শারিকা লাকা’। (হাজির হে প্রভু! আপনার কোনো শরিক নেই)। কারণ শিরকের পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ এবং এটি ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। মুশরিকদের স্থান হলো জাহান্নাম। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে শিরক করবে আল্লাহ তার জন্য অবশ্যই জান্নাত হারাম করে দেবেন। এবং তার আভাস জাহান্নাম।’

(সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৭২)।

লেখক : সিনিয়র শিক্ষক (ইসলাম শিক্ষা) চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল অ্যান্ড কলেজ

 

বিডি-প্রতিদিন

Manual8 Ad Code

Latif Travels
Metropolitan University

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন

📞 মোবাইল: +8801712540420

✉️ ইমেইল: pavel.syl@gmail.com