ইসলামের ইতিহাসে মুমিনের কোরবানি
মুফতি ওমর বিন নাছির
ইসলামের ইতিহাস মূলত ত্যাগ, ধৈর্য, ঈমান ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আত্মনিবেদনের এক উজ্জ্বল ইতিহাস। যুগে যুগে মুমিনরা তাদের জীবন, সম্পদ, পরিবার, স্বপ্ন ও ভালোবাসার জিনিস আল্লাহর পথে উৎসর্গ করে ইসলামের মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
হজরত আদম (আ.)-এর পুত্র হাবিলের কোরবানি থেকে শুরু করে নবী ইবরাহিম (আ.)-এর অবিস্মরণীয় আত্মত্যাগ, ঈসমাইল (আ.)-এর আনুগত্য, এবং মহানবী (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের জীবন—সবখানেই ফুটে উঠেছে একজন সত্যিকারের মুমিনের কোরবানির মহিমা। ইসলামের ইতিহাস আমাদের শেখায়, ঈমান শুধু মুখের দাবি নয়; বরং আল্লাহর আদেশের সামনে নিজের ইচ্ছাকে বিলীন করে দেওয়ার নামই প্রকৃত কোরবানি। তাই কোরবানি শুধু পশু জবাইয়ের একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি মুমিনের অন্তরের তাকওয়া, ভালোবাসা ও আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের বহিঃপ্রকাশ ।
আনাস বিন মালিক (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় এসে দেখেন মদিনাবাসী নির্দিষ্ট দুটি দিনে খেলাধুলা ও আনন্দ করে থাকে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, এই দুটি দিন কিসের? সবাই বলল, জাহেলি যুগে আমরা এই দুই দিন খেলাধুলা করতাম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, মহান আল্লাহ তোমাদের এ দুই দিনের পরিবর্তে উত্তম দুটি দিন দান করেছেন। তা হলো ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতরের দিন।(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১১৩৪)
ইসলামের দৃষ্টিতে পার্থিব সহায়-সম্পদ ও অর্থবিত্তের মোহ থেকে মুক্তি এবং মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের অন্যতম মাধ্যম পশু কোরবানি।
এর মাধ্যমে ব্যক্তি নিজের পশু-প্রবৃত্তি দমন, আল্লাহর জন্য আত্মনিবেদন এবং সৃষ্টির সেবায় আত্মনিয়োগের অনুপ্রেরণা পেয়ে থাকে। আল্লাহর কাছে জবাবদিহির ভয় তা নিশ্চিত করে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না তাদের গোশত এবং রক্ত, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ৩৭)
পৃথিবীর প্রায় সব প্রধান ধর্মে পশু কোরবানির রীতি আছে। ইসলামপূর্ব জাহেলি যুগেও পশু কোরবানির প্রচলন ছিল।
ঐতিহাসিকরা লেখেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পিতা আবদুল্লাহকে রক্ষার করার জন্য তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিব ১০০ উট কোরবানি দিয়েছিলেন।
কোরআনের বর্ণনা অনুসারে, আদম (আ.)-এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিল পশু কোরবানির মাধ্যমে ঈমানি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়েছিল। সেটাই ছিল ইসলামের ইতিহাসের প্রথম পশু কোরবানি। কোরবানিকে ইবরাহিম (আ.)-এর স্মৃতিস্মারক বলা হয়। আল্লাহ কর্তৃক নানা রকম পরীক্ষায় ইবরাহিম (আ.)-এর উত্তরণ এবং আল্লাহপ্রেমে তাঁর অসাধারণ আত্মত্যাগকে চিরস্মরণীয় করে রাখতেই আল্লাহ হজ ও কোরবানির বিধান দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘যে নিজেকে নির্বোধ করেছে, সে ছাড়া ইবরাহিমের ধর্মাদর্শ থেকে আর কে বিমুখ হবে! পৃথিবীতে তাকে আমি মনোনীত করেছি; আর আখিরাতেও সে অবশ্যই সৎকর্মপরায়ণের অন্যতম। তার প্রতিপালক যখন তাকে বলেছিলেন, আত্মসমর্পণ করো, সে বলেছিল, জগত্গুলোর প্রতিপালকের কাছে আত্মসমর্পণ করলাম।’(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৩০-১৩১)
মুসলিম সমাজে ঈদ উৎসবের বহিঃপ্রকাশ ঘটে নানাভাবে। যেমন—পরিচ্ছন্নতা অর্জন করা, উত্তম পোশাক পরিধান করা, পরস্পরকে অভিনন্দন জানানো, উচ্চৈঃস্বরে তাকবির পাঠ করা, বৈধ খেলাধুলা করা, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা, উত্তম খাবার খাওয়া এবং অসহায়-দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানো। ঈদের পোশাক, খাদ্য ও অন্যান্য আয়োজন নিয়ে বর্তমান সমাজে যে প্রতিযোগিতা দৃশ্যমান, তা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার পরিপন্থী। ইসলাম এসব আয়োজনে নিজের সামর্থ্য ও শরিয়তের সীমা সামনে রাখতে বলেছে। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, ‘বাজারে বিক্রি হচ্ছিল এমন একটি রেশমি জুব্বা নিয়ে ওমর (রা.) আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি এটি ক্রয় করে নিন। ঈদের সময় এবং প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় এটি দিয়ে নিজেকে সজ্জিত করবেন। তখন আল্লাহর রাসুল (সা.) তাঁকে বললেন, এটি তো তার পোশাক, যার পরকালে কল্যাণের কোনো অংশ নেই।’(সহিহ বুখারি, হাদিস : ৯৪৮)
ঈদ উৎসবের অনুষঙ্গ হলেও খাদ্যের কোনো সুনির্দিষ্ট তালিকা প্রদান করেনি ইসলাম, বরং উত্তম খাবার গ্রহণে উৎসাহিত করেছে, যেন প্রত্যেক মুসলমান স্থানীয় রীতি-সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাসের আলোকে তা গ্রহণ করতে পারে। তবে শর্ত হলো, এসব খাবার হালাল ও স্বাস্থ্যকর হতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আরাফার দিন, কোরবানির দিন ও আইয়ামে তাশরিক মুসলমানের ঈদের দিন। এগুলো খাওয়া ও পান করার দিন।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ৩০০৪)
কোরবানির ঈদের একটি বড় ইবাদত কোরবানি করা। আর্থিক সামর্থ্য আছে এমন প্রত্যেক মুসলমানের জন্য কোরবানি করা ওয়াজিব। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় ১০ বছর অবস্থান করেন। তিনি প্রতিবছর কোরবানি করেন।’(সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১৫০৭)
নবীজি (সা.) তাঁর নিজের, পরিবার ও উম্মতের পক্ষ থেকে পশু কোরবানি করতেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) কোরবানির ইচ্ছা করলে দুটি মোটাতাজা, মাংসল, শিংযুক্ত, ধূসর বর্ণের ও খাসি করা মেষ ক্রয় করতেন। অতঃপর এর একটি নিজ উম্মতের যারা আল্লাহর একত্বের সাক্ষ্য দেয় এবং তাঁর নবুয়তের সাক্ষ্য দেয় তাদের পক্ষ থেকে এবং অন্যটি মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর পরিবারবর্গের পক্ষ থেকে কোরবানি করতেন।’(সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩১২২)
মহানবী (সা.) তাঁর করা কোরবানির পশুর গোশত নিজেও খেতেন, পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও অসহায় মানুষদের খাওয়াতেন। আর তিনি উম্মতকেও তার নির্দেশ দিয়েছেন।’(আউনুল মাবুদ : ৭/৩৪৫)
গোশত বণ্টনের ক্ষেত্রে নবীজি (সা.)-এর কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর পরিবারকে কোরবানির এক-তৃতীয়াংশ আহার করাতেন, প্রতিবেশীদের এক-তৃতীয়াংশ আহার করাতেন আর ভিক্ষুকদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ সদকা করতেন।’ (আল-মুগনি : ৯/৪৪৯)
মূলত কোরবানির পশুর গোশত বিতরণের মাধ্যমে মুসলিমরা অন্যের সঙ্গে নিজেদের আনন্দ ভাগ করে নেয়, যেভাবে তারা ঈদুল ফিতরে সদকাতুল ফিতর বিতরণ করে অসহায় মানুষকে ঈদ আনন্দে শরিক করে নেয়। এ জন্য এক বছর মদিনায় অভাব বৃদ্ধি পেলে তিনি নির্দেশ দেন, কোরবানির পশুর গোশত যেন তিন দিনের বেশি সংরক্ষণ করা না হয়।(জাদুল মাআদ, পৃষ্ঠা-৪২৬)
রাসুলুল্লাহ (সা.) কোরবানির ঈদের দিন কিছু না খেয়ে ঈদের নামাজ পড়তেন এবং কোরবানির গোশত রান্না হলে তা থেকে সর্বপ্রথম খাবার গ্রহণ করতেন। (সুনানে দারেমি, হাদিস : ১৫৬৭)
অতএব, একজন মুমিন তখনই সফল হয়, যখন সে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রবৃত্তি, অহংকার, লোভ ও দুনিয়ার মোহকে কোরবানি করতে পারে। কেননা আল্লাহর জন্য ত্যাগের বিনিময়েই লাভ হয় আল্লাহর নৈকট্য, রহমত ও চিরস্থায়ী সফলতা। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত ইসলামের ইতিহাস থেকে আত্মত্যাগের শিক্ষা গ্রহণ করে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুক। আমিন।
বিডি-প্রতিদিন