• সিলেট, রাত ১০:৩১, ২৫শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

মুমিনের জীবনে হজের শিক্ষা ও প্রভাব

admin
প্রকাশিত মে ২৫, ২০২৬
মুমিনের জীবনে হজের শিক্ষা ও প্রভাব

Manual5 Ad Code

মুমিনের জীবনে হজের শিক্ষা ও প্রভাব

মো. আবদুল মজিদ মোল্লা

Manual6 Ad Code

 

হজ ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ এবং ফরজ বিধান। সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য জীবনে একবার হজ করা ফরজ। হজ নিছক কোনো ইবাদত নয়, এটি বরং ঈমান, আত্মশুদ্ধি, ত্যাগ, ভ্রাতৃত্ব ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণের প্রশিক্ষণ। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষা, বর্ণ ও সংস্কৃতির মানুষ একই পোশাকে, একই স্থানে এবং একই উদ্দেশ্যে সমবেত হয়ে আল্লাহর আনুগত্যের, ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মানুষের ওপর আল্লাহর জন্য এই ঘরের হজ করা ফরজ, যে সেখানে পৌঁছার সামর্থ্য রাখে।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৯৭)

Manual4 Ad Code

অন্য আয়াতে তিনি বলেন, ‘মানুষের মধ্যে হজের ঘোষণা করে দাও; তারা তোমার কাছে আসবে পদব্রজে এবং সব ধরনের ক্ষীণকায় উটের পিঠে, দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রম করে।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ২৭)

হজের একটি তাৎপর্য হলো আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণের শিক্ষা। কেননা হজের প্রতিটি আমল যথা-ইহরাম, তাওয়াফ, সাঈ, আরাফায় অবস্থান, মুজদালিফায় রাত যাপন এবং মিনায় কঙ্কর নিক্ষেপ ইবরাহিম (আ.), ইসমাইল (আ.) ও হাজেরা (রা.)-এর ত্যাগ, আনুগত্য ও আত্মসমর্পণের স্মৃতি বহন করে; বিশেষত ইসমাঈল (আ.)-কে কোরবানি করার প্রস্তুতি আল্লাহর আদেশের সামনে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত। হজ মুসলমানদের সেই আদর্শে উদ্বুদ্ধ করে। ফলে একজন হাজি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের ইচ্ছা, স্বার্থ ও কামনাকে ত্যাগ করে।

হজ মানুষকে তাকওয়া ও আল্লাহভীতির শিক্ষা দেয়। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা পাথেয় সংগ্রহ করো; আর সর্বোত্তম পাথেয় হলো তাকওয়া।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৯৭)

Manual6 Ad Code

আনাস (রা.) বলেন, জনৈক ব্যক্তি নবী করিম (সা.)-এর কাছে এসে বললে, হে আল্লাহর রাসুল! আমি সফরের ইচ্ছা করেছি, আপনি আমাকে কিছু পাথেয় দান করুন। নবী করিম (সা.) বলেন, আল্লাহ তোমাকে তাকওয়ার পাথেয় দান করুন! লোকটি বলল, আরো কিছু দান করুন। নবী (সা.) বললেন, আর তোমার গুনাহ ক্ষমা করুন! লোকটি বলল, আমার মা-বাবা আপনার ওপর উৎসর্গ হোন, আপনি আমাকে আরো কিছু দান করুন।

নবী (সা.) বলেন, আর আল্লাহ তোমার জন্য সর্বত্র কল্যাণকর বিষয়াদি সহজ করে দিন!
(সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৩৪৪৪)

হজের সময় হাজিদের অশ্লীলতা, ঝগড়া-বিবাদ ও পাপাচার থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফলে হজ মানুষকে আত্মসংযম, ধৈর্য ও নৈতিক শুদ্ধতার শিক্ষা দেয়। একজন মুসলমান হজ থেকে ফিরে এসে যেন নতুন জীবন শুরু করতে পারে, সেটিই হজের অন্যতম উদ্দেশ্য। কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘হজ নির্ধারিত মাসগুলোতে। সুতরাং যে ব্যক্তি তাতে হজ করা স্থির করে, তার জন্য হজের সময় স্ত্রী-সম্ভোগ, অন্যায় আচরণ ও কলহ-বিবাদ বিধেয় নয়।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৯৭)

হজ মুসলিম ভ্রাতৃত্ব ও সাম্যেরও এক উজ্জ্বল নিদর্শন। ধনী-গরিব, শাসক-প্রজা, আরব-অনারব সবাই একই ধরনের ইহরাম পরিধান করে আল্লাহর সামনে দাঁড়ায়। সেখানে বংশ, জাতি, ভাষা বা সামাজিক মর্যাদার কোনো পার্থক্য থাকে না। মহানবী (সা.) বিদায় হজের ভাষণে ঘোষণা করেছিলেন, ‘কোনো আরবের ওপর অনারবের এবং কোনো অনারবের ওপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই; তেমনি কোনো শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের বা কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই, একমাত্র তাকওয়া ছাড়া।’ (মুসনাদ আহমাদ)

হজের বিশাল সমাবেশ এই শিক্ষারই বাস্তব রূপ দেয়।

হজ মানুষের অন্তরে আখিরাতের চেতনা জাগ্রত করে। ইহরামের সাদা কাপড় কাফনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আরাফার ময়দানে লাখো মানুষের একত্র সমাবেশ কিয়ামতের দিনের মহাসমাবেশের কথা মনে করিয়ে দেয়। ফলে একজন হাজি উপলব্ধি করতে পারেন যে একদিন তাঁকে আল্লাহর সামনে উপস্থিত হয়ে নিজের কর্মের হিসাব দিতে হবে।

হজ গুনাহ মাফেরও এক মহাসুযোগ। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ করল এবং অশ্লীলতা ও পাপাচার থেকে বিরত থাকল, সে এমন অবস্থায় ফিরে আসবে যেমন তার মা তাকে জন্ম দিয়েছিল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৫২১)

অন্য হাদিসে তিনি বলেন, ‘কবুল হজের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছু নয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৭৭৩)

এ থেকে বোঝা যায়, হজ শুধু আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়; বরং এটি মানুষের আত্মিক পুনর্জাগরণের এক অনন্য সুযোগ।

হজের সবচেয়ে বড় প্রভাব হলো আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্ককে সুদৃঢ় করা। হজের প্রতিটি মুহূর্তে বান্দা আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন থাকে। তাওয়াফ, সাঈ, আরাফায় দোয়া, মুজদালিফায় অবস্থান এবং মিনার আমলগুলো মানুষের হৃদয়ে আল্লাহর মহত্ত্ব ও নিজের ক্ষুদ্রতার অনুভূতি সৃষ্টি করে। ফলে একজন হাজি উপলব্ধি করেন যে তাঁর জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। এই নির্দেশনা একজন মুমিনকে আত্মশুদ্ধি ও চরিত্র সংশোধনের পথে পরিচালিত করে।

হজ মানুষের মধ্যে ত্যাগ ও দায়িত্ববোধও জাগ্রত করে। হজ পালনের জন্য সময়, শ্রম ও সম্পদ ব্যয় করতে হয়। ফলে মানুষ উপলব্ধি করে যে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ স্বীকার করাই প্রকৃত সফলতার পথ। হজের মাধ্যমে মুসলমান ত্যাগ, ধৈর্য, শৃঙ্খলা ও মানবসেবার শিক্ষাও লাভ করে। লাখ লাখ মানুষের সঙ্গে একত্রে অবস্থান, কষ্ট সহ্য করা, অন্যের প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শন এবং নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলা একজন মুসলমানের চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। হজ তাকে শেখায় যে নেক কাজে মুমিন পরস্পরের সহযোগিতায় অগ্রসর হবে।

হজ হলো ঈমানকে নবায়ন, আত্মাকে পরিশুদ্ধ এবং মুসলিম উম্মাহর ঐক্যকে সুদৃঢ় করার এক মহান ইবাদত। এর প্রকৃত শিক্ষা হলো আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, তাকওয়া, ত্যাগ, ভ্রাতৃত্ব ও আখিরাতমুখী জীবন গঠন। যাঁরা হজের এসব শিক্ষা নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হন, তাঁদের জন্য হজ কেবল একটি সফর নয়; বরং জীবনের আমূল পরিবর্তনের এক মহৎ উপলক্ষ। হজ একজন মুমিনের জীবনে গভীর আধ্যাত্মিক, নৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বিস্তার করে। এটি মানুষের চিন্তা, চরিত্র ও জীবনদৃষ্টিকে পরিবর্তন করে। যে ব্যক্তি হজের প্রকৃত শিক্ষা আত্মস্থ করতে পারে, তার জীবন আল্লাহভীতি, আত্মসংযম ও নেক আমলের প্রতি অধিকতর অনুরাগী হয়ে ওঠে।

আল্লাহ সবাইকে কবুল হজের তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও ধর্ম গবেষক

Manual5 Ad Code

বিডি প্রতিদিন

Latif Travels
Metropolitan University

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন

📞 মোবাইল: +8801712540420

✉️ ইমেইল: pavel.syl@gmail.com