ইসলাম ও মানবিক মূল্যবোধ
মুফতি রফিকুল ইসলাম আল মাদানি
মানবতার ইতিহাসে যখনই নৈতিকতা, সহমর্মিতা ও মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটেছে, তখনই আসমানি দিশারি হিসেবে ইসলাম মানুষকে সত্য, ন্যায় ও কল্যাণের পথে আহ্বান করেছে।
ইসলাম কেবল কিছু ইবাদতের সমষ্টি নয়; বরং এটি এমন এক পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা মানুষের হৃদয়ে দয়া, মমতা, সহনশীলতা ও মানবপ্রেমের আলো জ্বালিয়ে দেয়। ইসলামের প্রতিটি বিধান মানুষের মর্যাদা রক্ষা এবং মানবিক সমাজ গঠনের শিক্ষা দেয়।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচার এবং আত্মীয়স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন। (সুরা আন-নাহল : ৯০) এই আয়াত মানবিক মূল্যবোধের এক চিরন্তন ঘোষণা। এখানে ন্যায়বিচার, সদাচার ও পারস্পরিক সহানুভূতির যে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। তা সমাজকে শান্তি ও সৌন্দর্যের পথে পরিচালিত করে। ইসলাম মানুষের ধর্ম, বর্ণ কিংবা ভাষার ভেদাভেদ নয়; বরং মানুষ হিসেবে প্রত্যেকের মর্যাদাকে সম্মান করতে শেখায়। রসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মানবতার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। তাঁর চরিত্রে দয়া, ক্ষমা ও সহমর্মিতার এমন অপূর্ব সমন্বয় ছিল, যা সমগ্র মানবজাতির জন্য আদর্শ। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি।’ (সুরা আল-আম্বিয়া : ১০৭) তিনি ক্ষুধার্তকে আহার দিয়েছেন, এতিমের মাথায় স্নেহের হাত রেখেছেন, অসুস্থের খোঁজখবর নিয়েছেন এবং প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। এমনকি যারা তাঁর বিরোধিতা করেছে, তাদের প্রতিও তিনি উত্তম আচরণ করেছেন। তাই ইসলাম মানবিকতার ধর্ম-এ কথা কেবল তাত্ত্বিক নয়, বরং বাস্তব সত্য। একটি হাদিসে রসুল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যা ভালোবাসে, তার ভাইয়ের জন্যও তা ভালোবাসে।’ (সহিহ বুখারি) এই হাদিস মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিকে আরও সুদৃঢ় করে। স্বার্থপরতা নয়, বরং পারস্পরিক ভালোবাসা ও সহযোগিতাই ইসলামের শিক্ষা। বর্তমান পৃথিবীতে হিংসা, প্রতারণা, বিদ্বেষ ও অমানবিকতার যে অন্ধকার বিস্তার লাভ করেছে, তা দূর করতে ইসলামের এই মহান আদর্শ অপরিহার্য। আজকের সমাজে মানবিক মূল্যবোধের সংকট ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। পরিবারে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ কমে যাচ্ছে, সমাজে সহমর্মিতার পরিবর্তে স্বার্থপরতা স্থান করে নিচ্ছে। মানবিক মূল্যবোধবিহীন সমাজ কখনো শান্তি লাভ করতে পারে না। অর্থনৈতিক উন্নতি কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতি মানুষকে সাময়িক স্বাচ্ছন্দ্য দিতে পারে, কিন্তু হৃদয়ে যদি দয়া ও নৈতিকতা না থাকে, তবে সেই সভ্যতা এক সময় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। ইসলাম সেই ধ্বংস থেকে মানবজাতিকে রক্ষা করতে চায়। নৈতিকতা, সহমর্মিতাতাই ইসলামের শিক্ষা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ-সর্বত্র মানবিক গুণাবলির বিকাশ ঘটায়। আজ আমাদের প্রয়োজন ইসলামের প্রকৃত মানবিক শিক্ষাকে নিজেদের জীবনে ধারণ করা। মসজিদ, মাদ্রাসা, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নৈতিকতা ও মানবপ্রেমের চর্চা বাড়াতে হবে। কিন্তু অত্যন্ত বেদনাবিধুর বাস্তবতা এই যে, সমাজ যখন নৈতিক অবক্ষয় ও দুর্বিষহ সংকটের সন্ধিক্ষণে উপনীত, তখনো অনেক ব্যক্তি ইসলামের সুমহান আদর্শে নিজেদের শাসিত ও পরিশুদ্ধ করার পরিবর্তে নির্লজ্জভাবে ইসলামি বিধিবিধানকে ব্যঙ্গবিদ্রুপের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে। মানবসভ্যতার ইতিহাস সাক্ষী-যখন মানুষ সত্য, ন্যায় ও স্রষ্টার বিধানকে উপহাসের বস্তুতে পরিণত করে, তখন সমাজে নেমে আসে অস্থিরতা, নৈতিক অবক্ষয় ও আত্মিক শূন্যতা। আজও যারা ইসলামের সুশীতল আদর্শ গ্রহণের পরিবর্তে শরিয়তের বিধানকে ব্যঙ্গবিদ্রুপ করে, তারা মূলত নিজেদের হৃদয়কে হেদায়াতের আলো থেকে বঞ্চিত করছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা সতর্ক করে বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহ, তাঁর আয়াত ও তাঁর রসুলকে নিয়ে উপহাস কর না।’ এ ধরনের বিদ্রুপ মানুষের ইমান, চরিত্র ও সমাজের শান্তিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। সাময়িক উল্লাস ও কটূক্তি হয়তো কিছু মানুষের কাছে আধুনিকতার প্রতীক মনে হতে পারে, কিন্তু এর পরিণতি দুনিয়ায় অশান্তি আর আখিরাতে কঠিন জবাবদিহিতা। অতএব, মুসলমানের কর্তব্য হলো বিদ্বেষ ও উত্তেজনার পথ নয়; বরং জ্ঞান, প্রজ্ঞা, উত্তম চরিত্র ও দাওয়াতের মাধ্যমে ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরা। কারণ সত্যের আলো কখনো উপহাসে নিভে যায় না; বরং সময়ের ব্যবধানে আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। বর্তমান সমাজ আজ নৈতিক অবক্ষয়, খুন, ধর্ষণ, স্বার্থপরতা, অশ্লীলতা, মাদক, অন্যায় ও পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার অন্ধকারে নিমজ্জিত। আল্লাহভীতি ও আখিরাতের জবাবদিহির অনুভূতি দুর্বল হয়ে যাওয়ায় মানুষের হৃদয় থেকে দয়া, সততা ও মানবিকতা ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। বস্তুবাদী মোহ মানুষকে বাহ্যিক উন্নতির দিকে নিয়ে গেলেও আত্মিক শূন্যতা সমাজকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছে। এই সংকট থেকে মুক্তির একমাত্র কার্যকর পথ হলো ইসলামের সুমহান আদর্শে ফিরে আসা। কোরআন-সুন্নাহভিত্তিক জীবনব্যবস্থা, নৈতিক শিক্ষা, পরিবারে দীনি পরিবেশ এবং তরুণদের ইমানি চেতনা জাগ্রত করার মাধ্যমেই সমাজে শান্তি, শুদ্ধতা ও মানবিক মূল্যবোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠা সম্ভব।
♦ লেখক : গবেষক, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরা, ঢাকা
বিডি প্রতিদিন