সিলেটে বে*প*রো*য়া কিশোর গ্যা*ং, পনেরো দিনে ২ খু ন
এহিয়া আহমদ
সিলেট নগরীর পাড়া-মহল্লায় ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য। আধিপত্য বিস্তার, চুরি, ছিনতাই থেকে শুরু করে খুনসহ সব ধরনের অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে বেপরোয়া এসব কিশোররা। নগরজুড়ে দিন-রাত প্রকাশ্যে আড্ডা, সিগারেট সেবন, দলবদ্ধ অবস্থান থেকে শুরু করে অস্ত্রের মহড়া সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে তৈরি হয়েছে তীব্র আতঙ্ক।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঝে মাঝে অভিযান চালালেও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর উদ্যোগের অভাবে অপরাধীচক্রগুলো ফের সক্রিয় হয়ে উঠছে। গত অর্ধমাসের ব্যবধানে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, আধিপত্য বিস্তার ও সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বে ২ কিশোরের মৃত্যু, আহত অনেকেই এবং একাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বেপরোয়া এসব কিশোরদের কর্মকাণ্ডে সিলেটের কিশোর অপরাধ এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করছেন সচেতন নাগরিকরা।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাতে বাদামবাগিচা এলাকায় প্রতিপক্ষ কিশোর গ্যাং-এর ছুরিকাঘাতে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক কিশোর খুন হয়েছে। এছাড়া গতকাল শুক্রবার বিকেলেও নয়াসড়ক এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ সংঘটিত হয়। এসময় একজন কিশোর গুরুতর আহত হন। এর আগে ১২ নভেম্বর মহানগরীর বালুচরে কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ছুরিকাঘাতে আহত এক কিশোর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে- মহানগরীর টিলাগড় পয়েন্ট, বালুচর, শাহী ঈদগাহ এলাকা, ইলেকট্রিক সাপ্লাই, আম্বরখানা, সুবিদবাজার, মদিনা মার্কেট, তেমুখী পয়েন্ট, জিন্দাবাজার, নবাবরোড, মাছুদিঘীরপার, লালাদিঘীর, কুয়ারপার, শেখঘাট, শিবগঞ্জ, উপশহর, ওসমানী মেডিকেল কলেজ এলাকাসহ প্রতিটি পাড়া মহল্লায় কিশোর গ্যাং তৈরি হয়েছে। এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা বেপরোয়া। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটানোর পাশাপাশি আধিপত্য নিয়ে নিজেদের মধ্যেও করেন মারামারি। এতে ঘটে প্রাণহানির ঘটনা।
লেখাপড়া ছেড়ে চেয়ার-টেবিল পেতে রাতভর আড্ডা, প্রকাশ্যে সিগারেট খাওয়া, রাস্তা দখল করে অবস্থান, এলাকার মহিলা-মেয়েদের দেখে টিজ করা এসব এখন নিয়মিত দৃশ্য। এলাকাবাসীর অভিযোগ, পুলিশের কাছে অভিযোগ জানালেও পুলিশি টহল বা নজরদারি তেমন একটা লক্ষ্য করা যায় নি। অভিযোগ দিলে পুলিশ কিছুদিন অভিযান পরিচালনা করলেও ফের কিশোররা সক্রিয় হয়ে অপকর্মে লিপ্ত হয়। কেউ কেউ বলছেন, আগে এই কিশোররা ছাত্রলীগ পরিচয় দিত, এখন ছাত্রদলের পরিচয় ব্যবহার করছে। আবার কোনো কোনো সময় প্রতিবাদ করতে গেলে মব সৃষ্টি করার চেষ্টাও করে। তাই সবাই মান-সম্মানের ভয়ে কেউই আর প্রতিবাদ করতে যান না।
এদিকে সিলেটের সচেতন নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দরা বলছেন, ‘সিলেট নগরীর বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য যে উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে, তা শুধু আইনশৃঙ্খলার চ্যালেঞ্জ নয়—এটি পুরো সমাজের জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা। কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পেছনে পারিবারিক অনুপস্থিতি, বিদ্যালয়ে অনিয়মিত উপস্থিতি, মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতা এবং এলাকায় যথাযথ তদারকির অভাব প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে। নগরীর প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় রাতভর কিশোরদের আড্ডা, দলবদ্ধ অবস্থান ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের ওপর কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে। পাশাপাশি কিশোরদের খেলাধুলা, সংস্কৃতি, আইটি শিক্ষাসহ সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। অপরাধে জড়িত কিশোরদের ক্ষেত্রে কেবল দমন নয় তাদের মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা, কাউন্সেলিং এবং পুনর্বাসন ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা জরুরি।’
সর্বশেষ কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য বিস্তার নিয়ে এবং সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বের জেরে ছুরিকাঘাতে খুন হয়েছেন সিলেট নগরীর বাদামবাগিচার ইলাশকান্দি এলাকার সপ্তম শ্রেণির ছাত্র শাহ মাহমুদ হাসান তপু (১৫)। এদিকে তপু হত্যাকাণ্ডে পরিবারের অভিযোগ, বাসা থেকে ডেকে নিয়ে তাকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়। আর পুলিশ বলছে, গ্রুপ সংক্রান্ত বিষয়ের জেরে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) রাত প্রায় ১২টার দিকে তাকে ছুরিকাঘাত করা হয়। পরদিন শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) সকালে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত জাহিদ হাসানসহ তিন কিশোরকে আটক করেছে পুলিশ। নিহত তপু খাসদবির উচ্চবিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র এবং চার ভাই-দুই বোনের মধ্যে সবার ছোট। শুক্রবার সন্ধ্যায় জানাজা শেষে তার দাফন সম্পন্ন হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, তপু ও জাহিদের মধ্যে দীর্ঘদিনের সিনিয়র-জুনিয়র বিরোধ ছিল। ওই বিরোধ মেটাতে এবং দুই গ্রুপ একসঙ্গে চলবে কি-না এ নিয়ে আলোচনা করতে বৃহস্পতিবার রাতে তপুর বাড়িতে যায় জাহিদসহ কয়েকজন। সেখানে তাদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়। এই তর্ক-বিরোধ থেকেই পরে সংঘর্ষের সূত্রপাত এবং শেষ পর্যন্ত এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী রাতের ঘটনায় তপু ও জাহিদসহ দুই পক্ষের অনুসারীদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি থেকে সংঘর্ষ বেঁধে যায়। একপর্যায়ে তপু জাহিদকে মারধর করে। পরে ধস্তাধস্তির সময় সুযোগ পেয়ে জাহিদ তপুর পেটে ছুরিকাঘাত করে।
পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার রাতে তপুকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যায় জাহিদ ও তার সহযোগীরা। পরে তাকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়। তবে কেন এই হত্যাকাণ্ড-এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না তপুর পরিবার। নিহতের বড় ভাই রুবেল আহমদ বলেন, ‘বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে জাহিদরা বাসা থেকে ডেকে নিয়ে তপুকে হত্যা করেছে। কেন করেছে জানি না।’
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী তপুর এক বন্ধু জানান, সেদিন রাতে তপুদের সংখ্যা ছিল তিনজন। আর জাহিদদের ১৫-২০ জন। তবু পরিস্থিতি এমন ছিল না যে তারা তপুকে মেরে ফেলবে। কিন্তু ধস্তাধস্তির সময় তপু পড়ে গেলে জাহিদ তার পেটে ছুরি ঢুকিয়ে দেয়।’
ঘটনার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে প্রধান অভিযুক্ত জাহিদসহ তার দুই সহযোগীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গ্রেফতারকৃতরা হলেন- এয়ারপোর্ট থানার খাসদবির এলাকার মো. জাহিদ হাসান, কোতোয়ালী থানার লোহারপাড়া এলাকার মো. অনিক মিয়া ও মো. জুনেদ আহমদকে। তবে এখনো কোনো মামলা হয়নি।
এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই শুক্রবার (২৮ নভেম্বর) বিকেল ৫টার দিকে সিলেট মহানগরীর জেলরোড এলাকায় হাওয়াপাড়া গলির মুখে কিশোর গ্যাংয়ের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে দুই পক্ষের কিশোররা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে একে অপরের ওপর হামলা চালায়। এতে একজন কিশোর গুরুতর আহত হয়। আহত কিশোরকে তার সঙ্গে থাকা বন্ধুরা দ্রুত সিএনজি অটোরিকশায় করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। ওই ঘটনায় আহত কিশোরের পিতা বাদী হয়ে কোতোয়ালী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। কাজিটুলা এলাকা ও জেলরোড এলাকার কিশোরদের মধ্যে স্কুল কেন্দ্রীক পূর্ব শত্রুতার জের ধরেই এ ঘটনা ঘটেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে।
এর আগে, ১২ নভেম্বর মহানগরীর বালুচরে কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের হামলায় আহত ফাহিম আহমদ (১৫) নামে এক কিশোর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। ফাহিম দোয়ারাবাজার উপজেলার কান্দিগাঁও গ্রামের হারুন রশিদের ছেলে। পরিবারের সঙ্গে সে বালুচর ছাড়ারপাড় এলাকায় থাকতো। ফাহিমের ভাই মামুন তার ভাইকে মারার জন্য বুলেট মামুন গ্রুপের লোকজনকে দায়ী করেন। এ ঘটনায় ফাহিমের পিতা অভিযোগ দায়ের করলে শাহপরান থানাপুলিশ সবুজ আহমদ রেহান নামে একজনকে আটক করে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মহানগরীর বালুচর এলাকার বিভিন্ন টিলায় কয়েকটি কিশোর গ্যাংয়ের আস্তানা। তারা সেখানে প্রায়ই অস্ত্রের মহড়া দেয়। এরকম একটি ভিডিও সম্প্রতি ভার্চুয়াল মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। এতে উদ্বেগে আছেন এলাকার বাসিন্দারা।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ কমিশনার (উত্তর) ও মিডিয়া অফিসার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘উভয় ঘটনায় পৃথকভাবে মামলা রুজু করা হয়েছে এবং ইতোমধ্যে জড়িতদের শনাক্ত করতে পুলিশ ব্যাপক চিরুনি অভিযান পরিচালনা করছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় এসএমপি সবসময়ই শূন্যসহিষ্ণু নীতি অনুসরণ করে থাকে। শাহজালালের পূণ্যভূমিতে কোনো ধরনের কিশোর অপরাধীচক্র কিংবা গ্রুপের অস্তিত্ব থাকতে দেওয়া হবে না। যারা শান্ত পরিবেশ নষ্টের চেষ্টা করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও পেশাদারিত্ব নিয়ে কাজ করছি, এবং এ ধরনের অপকর্মে জড়িত কেউই এসএমপির নজর এড়াতে পারবে না।’
সিলেটভিউ২৪ডটকম