• সিলেট, সন্ধ্যা ৬:৩৬, ২২শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

গলিভাই!

admin
প্রকাশিত নভেম্বর ৩০, ২০২৫
গলিভাই!

Manual1 Ad Code

হাওরের গলিভাই ‘জাওর’!

উজ্জ্বল মেহেদী

ঘনঘোর বর্ষায় হাওরে উথালপাতাল ঢেউ! ভিন্ন তো বটে। তবে ঢেউ অভিন্ন নয়। হাওরের ঢেউকে কি বলে? প্রান্তজনে বলা হয় ‘আফাল’। জলের ফাল আফাল! প্রান্তজনের পরিভাষায় দিকভ্রান্ত নই। প্রান্তই সত্য! সেই সত্যে ভর করে আরেক পরিভাষায় পরিভ্রমণ। হাওর নয়, ‘জাওর’! বিস্ময় এখানেই।

Manual7 Ad Code

বাংলাদেশে জলাভূমির তালিকায় হাওরের সঙ্গে পরিচিত শব্দ ‘বাওর’ আছে। দুটোই জলাভূমি; তবে প্রকৃতি, গঠন ও ব্যবহারে আলাদা। নদীর পুরনো বাঁক বা বিচ্ছিন্ন অংশ যখন বদ্ধ জলাশয়ে রূপ নেয়, তখন তা অর্ধচন্দ্রাকৃতি বাওর হয়। যশোর, কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ এলাকায় যেগুলো প্রচুর দেখা যায়। অন্যদিকে হাওর দেখা যায় দেশের উত্তরপূর্বাঞ্চলের সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনায়। জলমহাল ব্যবস্থাপনার প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, আয়তন ২০ একরের বেশি হলে তা হাওর হিসেবে বিবেচিত হয়।

এই পরিচিত পরিভাষাগুলোর বাইরে এবার পাওয়া গেল আরেকটি নাম ‘জাওর’। এটি বিল-আকৃতির জলাভূমি।

সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার মাঝামাঝি অঞ্চলে অবস্থিত পাথরচাউলি জলমহালের ভেতরে রয়েছে ‘সাতবিলা জাওর’। ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে, সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ইছাকলস ইউনিয়নে এর অবস্থান। আয়তন প্রায় ৩০ একর। যাতায়াতও যথারীতি দুর্গম। গাড়ি ও নৌকায় কিছু পথ পাড়ি দিয়ে শেষে হাঁটতে হয়।

Manual3 Ad Code

জাওরে যাওয়ার দুটো পথ আছে। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা হয়ে আমবাড়ি-চাটিবহর পর্যন্ত নৌপথ, অথবা ছাতক উপজেলা হয়ে সুরমা নদীর ভুরাখালি স্লুইসগেট থেকে। দেখতে হাওর বা বিলের মতো হলেও জাওরের ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যে রয়েছে নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য। মাছ ধরার মৌসুমে বড় মাছের চেয়ে শিং, বাইম, কৈসহ সুস্বাদু ‘জিউল মাছ’ বেশি মেলে। মাছ ধরা শেষে জলাভূমি ব্যবহৃত হয় হালিচারা চাষে। হাওরের মতো এখানেও বোরো ধান চাষ হয়।

জাওরপারের বনে রয়েছে নানা ওষুধি গাছ, গুল্ম ও দেশি লতা–বৃক্ষ। দেশি পাখির উপস্থিতি বেশি হলেও অতিথি পাখি এখানে প্রায় আসে না। শীতকালে সাইবেরিয়া থেকে অতিথি পাখি যখন হাওরে নেমে আসে, সাতবিলা জাওরে তখনও দেখা মেলে মূলত দেশি প্রজাতির পাখপাখালির। জাওরের মধ্যভাগে সাদা বকের ঝাঁক দেখা গেছে; অদূরে স্থানীয় মানুষজন হাঁস চড়াচ্ছেন। দুটি দৃশ্যই এখানে খুব স্বাভাবিক।

বেসরকারি সংস্থা ‘সিএনআরএস’ ও ‘আইডিয়া’-তে জলাভূমির কাজের অভিজ্ঞতার পর সাতবিলা জাওর দেখতে সঙ্গী হয়েছিলেন জলাভূমির গবেষক মোহাম্মদ আজিজুর রহমান। গত বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) দিনভর অনুসন্ধানে তিনি মনে করেন, সাতবিলা জাওর হতে পারে বাংলাদেশের প্রথম বিশেষায়িত জলাভূমি। নিজস্ব বৈশিষ্ট্য থেকেই যার নাম ‘জাওর’। জাওরপারের বন-ঝোপঝাড় ঘুরে তিনি যে উচ্ছ্বাস নিয়ে জানান, তাতে স্পষ্ট এ অঞ্চলের জলাভূমির জীববৈচিত্র্য এখনো অনেকটাই সুরক্ষিত। নলখাগড়া, চাইল্লাবন, পাথরকুচি, বিষকুকড়া, এমন বহু উদ্ভিদ দেশের অধিকাংশ জলাভূমিতে প্রায় বিলুপ্ত। বিষাক্ত বনজ উদ্ভিদ ‘বিষকুকড়া’ স্থানীয় মৎস্যজীবীরা এখনও মাছ ধরার বিশেষ কৌশলে ব্যবহার করেন।

Manual3 Ad Code

জাওরপারের বনে দেখা মেলে বিস্ময়কর আরেকটি বৃক্ষের। জালের মতো সতেজ ও সবুজ এবং মিহি পাতার এই গাছ পরিপক্ব হলে জলাভূমিতে মাছ শিকার করার ‘কাঁটা দেওয়ার’ সনাতন পদ্ধতিতে ব্যবহৃত হয়। শীতলপাটির কাঁচামাল মূরতা বেতের ঝাড়ও রয়েছে চারপাশে। একেক ঝাঁড়ে প্রায় শতাধিক মূরতাগাছ।

Manual4 Ad Code

জেলা প্রশাসনের প্রচলিত জলমহাল ব্যবস্থাপনায় পাথরচাউলি হাওরের ইজারাদার মো. সুহেল মিয়া জানান, সাতবিলা জাওর যে হাওর বা বিল থেকে ভিন্ন, তা আগে কখনো ভাবনায় আসেনি। তবে নামের ভিন্নতা তাদের ভাবিয়েছে। জলমহাল পরিচালনায় দেড় দশকের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানান, জাওরপারের বনঝোপে দেশি পাখি বেশি, জলাভূমিতে দেখা যায় সাদা বক ও জলজ পাখি। ধান, মাছ ও হাঁস প্রতিপালনে এটি সারা বছর ব্যবহৃত হয়। সাতটি বিল মিলে ‘সাতবিলা’ নামের উৎপত্তি হলেও স্থানীয়রা বলেন, ‘জাওর হাওরের গলিভাই’!

‘গলিভাই’ প্রান্তজনের ভাষা। গলায় গলায় ভাব অর্থে বলা হয়। হাওর–বাওর–বিল আলাদা পরিচয়ে থাকলেও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় জাওরকে পৃথক শ্রেণি হিসেবে চিহ্নিত করা জরুরি। এমনই মত হাওর গবেষকদের। হাওর রিসার্চ সেন্টারের (এইচআরসি) প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান সজলকান্তি সরকার জানান, চার দশকের অনুসন্ধানে ‘জাওর’ নামের জলাভূমির অস্তিত্ব তিনি এই প্রথম শুনলেন। তিনি বলেন, ‘একসময় জলাভূমি প্রাকৃতিকভাবে বন–ঝোপ–জঙ্গলপূর্ণ ছিল। এগুলোকে আলাদা করে জংলা বা জাঙ্গাল বলা হতো। বিশেষ করে পাহাড় পাদদেশের জলাভূমিতে এমন বৈচিত্র্যময় লোকায়িত নাম পাওয়া যায়। জাওর হতে পারে জলাভূমির লোকায়িত নাম।’

হাওর গবেষক সজলকান্তি সরকার আরও বলেন, ‘হাওর বা বাওরের চেনা বৈশিষ্ট্য থেকে ভিন্ন কিছু অবশ্যই জাওরে আছে। নামটি লোকায়িত বা জনজীবনের মাধ্যমে প্রচলিত হলেও এটি উন্মোচন জরুরি। জাওরপারের মানুষকে সম্পৃক্ত করে গবেষণা করলে হাওর-বাওরের পর নতুন পরিভাষা হিসেবে জাওর যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠা পাবে, আর জলাভূমির নতুন উপাখ্যানও প্রকাশ পাবে।’

উজ্জ্বল মেহেদী: সাংবাদিক ও ‘জলোপাখ্যান’ সিরিজ গ্রন্থ লেখক।

Latif Travels
Metropolitan University

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন

📞 মোবাইল: +8801712540420

✉️ ইমেইল: pavel.syl@gmail.com