• সিলেট, রাত ৮:২১, ১লা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ক্ষমতার প্রকৃত মালিক আল্লাহ

admin
প্রকাশিত আগস্ট ১, ২০২৬
ক্ষমতার প্রকৃত মালিক আল্লাহ

Manual2 Ad Code

ক্ষমতার প্রকৃত মালিক আল্লাহ

মুফতি রফিকুল ইসলাম আল মাদানি

 

রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও নেতৃত্ব মানবসমাজের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমানত। ইসলাম এ ক্ষমতাকে কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর স্থায়ী সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করে না। বরং ঘোষণা করে যে প্রকৃত মালিক একমাত্র মহান আল্লাহ। তিনি তাঁর অসীম প্রজ্ঞা অনুযায়ী যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা থেকে অপসারণ করেন। কখন, কীভাবে এবং কোন প্রেক্ষাপটে এই পরিবর্তন ঘটবে, তা একমাত্র তাঁরই সিদ্ধান্ত। এ কারণে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে আল্লাহকে স্মরণ করা, তাঁর বিধানকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেওয়া এবং ন্যায়, ইনসাফ ও জবাবদিহির নীতি অনুসরণ করা প্রত্যেক শাসক ও প্রতিটি রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘বলুন, হে রাজত্বের মালিক আল্লাহ! আপনি যাকে ইচ্ছা রাজত্ব দান করেন এবং যাঁর কাছ থেকে ইচ্ছা রাজত্ব কেড়ে নেন। যাকে ইচ্ছা সম্মানিত করেন এবং যাকে ইচ্ছা লাঞ্ছিত করেন। সব কল্যাণ আপনার হাতেই। নিশ্চয়ই আপনি সবকিছুর ওপর সর্বশক্তিমান।’ (সুরা আলে ইমরান-২৬)

এই আয়াত রাষ্ট্রক্ষমতা সম্পর্কে ইসলামের মৌলিক দর্শন তুলে ধরে। ক্ষমতা মানুষের কৌশল, শক্তি বা সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর নির্ভরশীল মনে হলেও সর্বশেষ সিদ্ধান্ত আল্লাহরই। তাই ক্ষমতা লাভে যেমন অহংকারের সুযোগ নেই, তেমনি ক্ষমতা হারালে হতাশ হওয়ারও কারণ নেই। বরং উভয় অবস্থায় আল্লাহর বিধান মেনে চলাই প্রকৃত মুমিনের পরিচয়। কোরআনের আরেক স্থানে বলা আছে, ‘আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন যে তোমরা আমানত যথাযথভাবে তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দেবে; আর যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে, তখন ন্যায়বিচার করবে।’ (সুরা আন-নিসা, ৫৮)। রাষ্ট্রক্ষমতা একটি মহান আমানত। এ আমানতের যথাযথ ব্যবহার হলো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, জনগণের অধিকার সংরক্ষণ, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করা। শাসক যদি ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত স্বার্থ, প্রতিহিংসা বা জুলুমের হাতিয়ার বানায়, তবে সে আমানতের খেয়ানত করে। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। শাসক জনগণের অভিভাবক; তাকে তার অধীনদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

Manual5 Ad Code

এই হাদিস রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহির গুরুত্ব স্পষ্ট করে। ইসলামে শাসক কোনো জবাবদিহিহীন ব্যক্তি নন; বরং আল্লাহর কাছে তিনি সর্বপ্রথম জবাবদিহি করবেন। অতএব ক্ষমতা যত বড়, দায়িত্বও তত বড়।

ইসলামের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখন কোনো জাতি আল্লাহর নির্দেশনা উপেক্ষা করেছে, অন্যায়, দুর্নীতি ও সীমালঙ্ঘনে লিপ্ত হয়েছে, তখন তাদের পতন ঘটেছে। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।’ (সুরা আর-রাদ, ১১)

অতএব রাষ্ট্রের উন্নতি বা অবনতি কেবল অর্থনীতি, সামরিক শক্তি কিংবা প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে না; নৈতিকতা, ন্যায়বিচার, আল্লাহভীতি এবং সৎ শাসনও এর মৌলিক ভিত্তি।

Manual8 Ad Code

আজকের বিশ্বে ক্ষমতার প্রতিযোগিতা, রাজনৈতিক সংঘাত, দুর্নীতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের নানা ঘটনা আমাদের সামনে প্রতিনিয়ত ঘটছে। এসব বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দেয় যে রাষ্ট্রক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। ইতিহাসে বহু পরাক্রমশালী শাসকের পতন এবং সাম্রাজ্য বিলীন হয়েছে। অথচ যারা ন্যায়নীতি, ইনসাফ ও জনগণের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন, ইতিহাসে তাদের স্মরণ করা হয় সম্মানের সঙ্গে। আল্লাহ আল কোরআনে আদ, সামুদ ও ফেরাউনের মতো পরাক্রমশালী জাতিগুলোর পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তারা শক্তি, সম্পদ ও সভ্যতায় অতুলনীয় হওয়া সত্ত্বেও সীমা লঙ্ঘন করেছিল। ফলে আল্লাহ তাদের ওপর কঠিন শাস্তি অবতীর্ণ করেন এবং তাদের ক্ষমতা ও গৌরব ধ্বংস করে দেন। এতে শিক্ষণীয় হলো, রাষ্ট্র ও ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়; আল্লাহর অবাধ্যতা, জুলুম ও অন্যায়ের পরিণতি অবশ্যম্ভাবী, আর ন্যায়, তাকওয়া ও আল্লাহভীতিই ব্যক্তি ও জাতির স্থায়ী কল্যাণের একমাত্র পথ। (সুরা আল-ফজর, ৬-১৩)

রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা কেবল ধর্মীয় আদর্শ নয়; বরং সুশাসনের মৌলিক নীতি। সততা, জবাবদিহি, পরামর্শভিত্তিক সিদ্ধান্ত, আইনের শাসন, মানবিক মর্যাদা রক্ষা এবং দুর্বল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা- এসব ইসলামি রাষ্ট্রচিন্তার অপরিহার্য উপাদান। সবশেষে বলা যায়, রাষ্ট্র ও ক্ষমতার প্রকৃত মালিক একমাত্র মহান আল্লাহ। তিনি তাঁর হিকমত অনুযায়ী ক্ষমতা প্রদান করেন এবং সময় হলে তা ফিরিয়ে নেন। তাই রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের উচিত আল্লাহকে সর্বদা স্মরণ করা, তাঁর বিধানকে সম্মান করা এবং ন্যায় ও ইনসাফের ভিত্তিতে দায়িত্ব পালন করা। অন্যথায় ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র- সবাইকে অন্যায়, অস্থিরতা ও ভোগান্তির কঠিন পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে। কোরআন ও সুন্নাহর শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ক্ষমতার প্রকৃত মর্যাদা তার স্থায়িত্বে নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে তার ন্যায়সংগত ব্যবহারে।

Manual1 Ad Code

♦ লেখক : গবেষক, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরা, ঢাকা

বিডি প্রতিদিন

Manual4 Ad Code

Latif Travels
Metropolitan University

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন

📞 মোবাইল: +8801712540420

✉️ ইমেইল: pavel.syl@gmail.com