প্রতীকী ছবি
‘আল্লাহর বান্দা’ পরিচয় সবচেয়ে মর্যাদার
মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ
মানুষের সর্বোচ্চ মর্যাদা ও সম্মান হলো সে আল্লাহ তাআলার বান্দা বা ‘আব্দ’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। বান্দা যত বেশি আল্লাহর দাসত্বকে বাস্তবায়ন করবে, ততই তার পূর্ণতা বৃদ্ধি পাবে এবং তার মর্যাদা উঁচু হবে।
আর যে ব্যক্তি মনে করে যে কোনো সৃষ্টিজীব কোনো দিক থেকে দাসত্বের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যেতে পারে, অথবা দাসত্ব থেকে বেরিয়ে যাওয়াই অধিক পূর্ণতা- সে সৃষ্টিজগতের সবচেয়ে অজ্ঞ, বরং সবচেয়ে পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘‘তারা বলল, ‘পরম করুণাময় সন্তান গ্রহণ করেছেন।’ তিনি পবিত্র! বরং তারা তো সম্মানিত বান্দা।’’ (সুরা : আল-আম্বিয়া, আয়াত : ২৬-২৭)।
‘আল্লাহর বান্দা’ সম্মান ও প্রশংসার পরিচয়
আল্লাহর বান্দা হওয়া অপমানের কোনো বিষয় নয়; বরং এটি মর্যাদা, প্রশংসা ও গৌরবের পরিচয়। এ জন্য আল্লাহ তাআলা তাঁর মনোনীত বহু নবী-রাসুলকে ‘আমার বান্দা’ বলে অভিহিত করেছেন।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আর স্মরণ করো আমার বান্দাদের- ইবরাহিম, ইসহাক ও ইয়াকুবকে; তারা ছিল শক্তি ও প্রজ্ঞার অধিকারী। নিশ্চয়ই আমি তাদের বিশেষভাবে পরকালের স্মরণের জন্য নির্বাচিত করেছিলাম। আর নিশ্চয়ই তারা আমাদের কাছে মনোনীত উত্তম ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত ছিল।’ (সুরা : সোয়াদ, আয়াত : ৪৫-৪৭)।
অন্য আয়াতে এসেছে, ‘ (ঈসা) মসিহ আল্লাহর বান্দা হতে কখনোই অহংকার করবেন না এবং নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতারাও নয়। আর যে ব্যক্তি তাঁর ইবাদত করতে অহংকার করবে ও ঔদ্ধত্য দেখাবে, তিনি তাদের সবাইকে নিজের কাছে সমবেত করবেন।’ (সুরা : আন-নিসা, আয়াত : ১৭২)।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্য ‘আব্দ’ বা আল্লাহর বান্দা হওয়া ছিল অত্যন্ত সম্মানের বিষয়। কারণ এটি মানুষের অর্জনযোগ্য সর্বোচ্চ মর্যাদাগুলোর একটি। একজন বান্দা যত বেশি আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদতের সিঁড়িতে অগ্রসর হয়, ততই সে দাসত্বের উচ্চতর স্তরে উন্নীত হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বাধিক প্রিয় সৃষ্টি। তাই তিনি দাসত্বের সর্বোচ্চ মর্যাদায় পৌঁছেছিলেন। এ জন্য আল্লাহ তাআলা তাঁকে তাঁর জীবনের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর সময় ‘তাঁর বান্দা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
১. ইসরা বা মিরাজের সময় :
আল্লাহ বলেন, ‘পবিত্র ও মহিমান্বিত সেই সত্তা, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায় নিয়ে গিয়েছিলেন, যার চারপাশ আমি বরকতময় করেছি, যাতে আমি তাকে আমার নিদর্শনসমূহ দেখাতে পারি। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’ (সুরা : আল-ইসরা, আয়াত : ১)।
এখানে মহান আল্লাহ রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে ‘তাঁর বান্দা’ বলে উল্লেখ করেছেন, যখন তাঁকে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত অলৌকিক রাত্রিকালীন সফরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
২. ওহি নাজিলের সময় :
আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর তিনি তাঁর বান্দার প্রতি যা ওহি করার ছিল, তা ওহি করলেন।’ (সুরা : আন-নাজম, আয়াত : ১০)।
এটি ছিল মিরাজের রাতে আসমানে সংঘটিত এক মহান ঘটনা। সেই সময়ও আল্লাহ তাঁর নবীকে ‘তাঁর বান্দা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
৩. কিতাব নাজিলের সময় :
আল্লাহ বলেন, ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি তাঁর বান্দার প্রতি কিতাব নাজিল করেছেন এবং তাতে কোনো বক্রতা রাখেননি।’ (সুরা : আল-কাহফ, আয়াত : ১)।
৪. মুমিনদের প্রতি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে প্রেরণের অনুগ্রহের সময় :
কোরআনে এসেছে, ‘তিনিই (আল্লাহ) তাঁর বান্দার প্রতি সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ নাজিল করেন, যাতে তিনি তোমাদের অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা : আল-হাদিদ, আয়াত : ৯)।
এখানেও নবী (সা.)-কে ‘তাঁর বান্দা’ বলা হয়েছে।
৫. শত্রুদের হাত থেকে তাঁর হেফাজতের সময় :
আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ কি তাঁর বান্দার জন্য যথেষ্ট নন? অথচ তারা তোমাকে আল্লাহ ছাড়া অন্যদের দ্বারা ভয় দেখায়। আর আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তার কোনো পথপ্রদর্শক নেই।’ (সুরা : আয-যুমার, আয়াত : ৩৬)।
এখানে আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবীকে ‘তাঁর বান্দা’ হিসেবে উল্লেখ করে তাঁর সাহায্য ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়েছেন।
৬. সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদতের সময় :
আল্লাহ বলেন, ‘আর যখন আল্লাহর বান্দা তাঁকে ডাকতে (ইবাদত করতে) দাঁড়ালেন, তখন তারা তাঁর চারপাশে ভিড় জমাতে উদ্যত হলো।’ (সুরা : আল-জিন, আয়াত : ১৯)।
এখানেও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইবাদত ও আল্লাহর প্রতি দাসত্বের অবস্থাকে ‘আল্লাহর বান্দা’ হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে। এসব আয়াত থেকে স্পষ্ট হয় যে আল্লাহর বান্দা হওয়া কোনো হীনতা নয়; বরং এটিই মানুষের সর্বোচ্চ সম্মান ও পূর্ণতার পরিচয়।
বিডি-প্রতিদিন