মহানবী (সা.) সমগ্র সৃষ্টির জন্য রহমত
ড. মুহাম্মদ নাছিরউদ্দীন সোহেল
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, একদা তিনি তাঁর ঘরে লোকদের একত্রিত করে রসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মদিনের বর্ণনা করছিলেন, যা শুনে উপস্থিত সবাই আনন্দে আত্মহারা হয়ে হজরত রসুল (সা.)-এর প্রশংসা করছিলেন (দরুদ ও সালাম পেশ করছিলেন)। এমন সময় রসুল (সা.) সেখানে উপস্থিত হলেন এবং (খুশি হয়ে) তাদের উদ্দেশে বললেন, ‘তোমাদের শাফায়েত করা আমার জন্য ওয়াজিব হয়ে গেছে।’ (দুররুল মুনাজ্জাম)
মহান আল্লাহ হজরত রসুল (সা.)-এর মাধ্যমে আপন সত্তা, গুণাবলি, মহিমা ও শান মর্যাদা প্রকাশ করেন। রসুল (সা.) সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য রহমতের প্রতীক। কোরআনে আল্লাহ তাঁর জীবনাদর্শকে অনুসরণের দৃষ্টান্ত হিসেবে ঘোষণা করে বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য রসুলুল্লাহ (সা.)-এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সুরা আল আহজাব : আয়াত ২১) হজরত রসুল (সা.)-এর আগমনের দিন সমগ্র মানবজাতির জন্য আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও হিদায়াতের পরিপূর্ণ প্রকাশ। আল্লাহ তাঁকে মানবজাতির জন্য সাক্ষ্যদাতা, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে প্রেরণ করেন। তাঁর আগমনের মহিমা ও মর্যাদা অনন্য। আল্লাহ হজরত রসুল (সা.)-কে হিজরিপূর্ব ৫৩ সালের ১২ রবিউল আউয়াল, সোমবার সুবেহ সাদিকের সময় পৃথিবীতে প্রেরণ করেন। তাঁকে প্রেরণের আনন্দে আল্লাহ ফেরেশতাদের নিয়ে তাঁর প্রতি দরুদ পাঠ করেন এবং মানুষকেও তাঁর প্রতি দরুদ পাঠ করে শ্রদ্ধার সঙ্গে সালাম জানাতে নির্দেশ করেন। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয় আল্লাহ নিজে ও তাঁর ফেরেশতারা নবীর ওপর দরুদ পাঠ করেন। হে বিশ্বাসীরা! তোমরাও তাঁর ওপর দরুদ পাঠ করো ও শ্রদ্ধার সঙ্গে সালাম পেশ করো।’ (সুরা আল আহজাব ৩৩ : আয়াত ৫৬)
হজরত রসুল (সা.)-এর শুভজন্মের বর্ণনা দিতে গিয়ে ‘মাওয়াহিবুল লাদ্দুন্নিয়া’ কিতাবে বলা হয়েছে, হজরত আমিনা (আ.) বলেন, ‘প্রশংসিত সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় আমি তাঁকে সিজদা অবস্থায় দেখেছিলাম। উভয় হাতের তর্জনী অঙ্গুলি দোয়া ক্রন্দনকারীর ন্যায় আকাশের দিকে প্রসারিত ছিল।’ মা আমিনা (আ.) আরও বলেন, সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর কারা যেন তাঁর সন্তানটিকে নিয়ে গিয়ে সমস্ত সৃষ্টিজগৎ পরিভ্রমণ করান। তিনি তাদের কথাবার্তা শুনেছিলেন। তিনি ঊর্ধ্বালোকের সম্মানিত ব্যক্তিগণের কথাবার্তার এক অংশে শুনেছিলেন যে ‘মুহাম্মদকে সব নবীর গুণাবলিতে বিভূষিত করো এবং সব আম্বিয়ার চরিত্র সাগরে ডুবিয়ে দাও।’ হজরত রসুল (সা.)-এর শুভ জন্মলগ্ন বহু অলৌকিক ঘটনা সংঘটিত হয়। যেমন নওশেরাওয়া বাদশাহের সিংহাসন নড়ে ওঠা; মাওয়া দরিয়া শুকিয়ে যাওয়া; সাম হওয়া হ্রদ পানিতে ভরে যাওয়া; পারস্যের অগ্নিকুণ্ড হঠাৎ নিভে যাওয়া; কাবাঘরের ‘হুবুল’ নামক বৃহৎ মূর্তিটির উপুড় হয়ে পড়ে যাওয়া ইত্যাদি। ‘নুরে মোহাম্মদী’ নামক কিতাবে আছে, ‘ওই রাতে কোরাইশদের একটি মূর্তির মুখ দিয়ে কথা বের হয়েছিল। সে বলেছিল, ‘একটি পবিত্র সন্তান প্রকাশ হওয়ায় চাদর পরিধান করেছি। এর জ্যোতিতে পৃথিবীর পূর্ব-পশ্চিমের সমস্ত এলাকা আলোকিত হয়ে গিয়েছে। তাঁরই উদ্দেশে সব মূর্তি উপুড় হয়ে পড়েছে। আর তাঁর ভয়ে প্রকম্পিত হয়ে বিশ্বের সমস্ত রাজা-বাদশাহের প্রাণ কেঁপে উঠেছে।’ তাফসিরে জালালাইনের অন্যতম লেখক আল্লামা ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতি (রহ.) প্রণীত ‘সাবিলুল হুদা ফি মাওলিদিল মুস্তফা’ কিতাবে হাদিস উল্লেখ করা হয়েছে। বিখ্যাত সাহাবি হজরত আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘একদা আমি হজরত রসুল (সা.)-এর সঙ্গে আবু আমের আনসারি (রা.)-এর বাড়িতে গিয়ে দেখতে পেলাম, হজরত আমের (রা.) তাঁর ছেলেমেয়ে ও আত্মীয়স্বজনকে একত্রিত করে হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর শুভ জন্মদিনের বিবরণ শোনাচ্ছেন। অতঃপর তিনি বলছিলেন, আজ সেই পবিত্র জন্মদিন। তাঁর এই কাজ দেখে হজরত রসুল (সা.) (অত্যন্ত আনন্দবোধ করলেন) বললেন, হে আমের! নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা তোমার জন্য তাঁর রহমতের দরজা খুলে দিয়েছেন এবং ফেরেশতারা তোমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছেন (যারা তোমার ন্যায় এমন কাজ করবে, তারাও তোমার মতো ফজিলত পাবে)।’ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, একদা তিনি তাঁর ঘরে লোকদের একত্রিত করে রসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মদিনের বর্ণনা করছিলেন, যা শুনে উপস্থিত সবাই আনন্দে আত্মহারা হয়ে হজরত রসুল (সা.)-এর প্রশংসা করছিলেন (দরুদ ও সালাম পেশ করছিলেন)। এমন সময় রসুল (সা.) সেখানে উপস্থিত হলেন এবং (খুশি হয়ে) তাদের উদ্দেশে বললেন, ‘তোমাদের শাফায়েত করা আমার জন্য ওয়াজিব হয়ে গেছে।’ (দুররুল মুনাজ্জাম)
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) প্রসঙ্গে ইমাম শিহাবুদ্দিন আহমদ বিন হাজার আল্-হায়তামি আশ-শাফি (রহ.) প্রণীত আননিয়ামাতুল কুবরা ‘আলাল আলম’ নামক কিতাবের ৭-৮ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হয়েছে : হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি নবী (সা.)-এর মিলাদ শরিফ পাঠে অর্থ ব্যয় করবে, সে আমার সঙ্গে বেহেশতে থাকবে।’ হজরত ওমর (রা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি নবী (সা.)-এর মিলাদ শরিফকে ইজ্জত ও সম্মান দেবে সে যেন ইসলামকে পুনর্জীবিত করল।’
হজরত ওসমান (রা.) বলেন, ‘প্রিয় নবী (সা.)-এর মিলাদ শরিফ পাঠ করতে গিয়ে যে ব্যক্তি অর্থ ব্যয় করবে, সে যেন বদর ও হুনাইনের মতো মহান যুদ্ধে অংশগ্রহণ করল।’ হজরত আলী (রা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি নবী (সা.)-এর মিলাদ শরিফকে সম্মান করবে এবং তা পাঠের আয়োজন করবে, সে দুনিয়া থেকে ইমানের সঙ্গে মৃত্যুবরণ করবে এবং বিনা হিসাবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’
♦ লেখক : গবেষক, কদর রিসার্চ অ্যান্ড পাবলিকেশন্স, ঢাকা
বিডি-প্রতিদিন