প্রতীকী ছবি
সাফল্যের সবচেয়ে বড় শত্রু ভয়
মারজিয়া আক্তার
ভয়ের কারণে কত অর্জন নষ্ট হয়েছে, কত প্রকল্প থেমে গেছে-তার কোনো হিসাব নেই। ভয়ের মূল কারণ হলো মানুষের নিজের সামর্থ্য সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকা এবং মহান আল্লাহ তার মধ্যে যে বিপুল শক্তি ও দক্ষতা দিয়েছেন তার পরিমাণ সম্পর্কে অজ্ঞ থাকা।
মানুষ যদি আল্লাহর সাহায্য গ্রহণ করে এবং নিজের এসব সামর্থ্যকে সঠিকভাবে কাজে লাগায়, তাহলে সে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে; বরং প্রত্যাশার চেয়েও বেশি অর্জন করতে সক্ষম হবে। জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়ার ভয় ও ব্যর্থতার আশঙ্কা সবার মধ্যেই থাকে। যেমন-আল্লাহ তাআলা মুসা (আ.) সম্পর্কে বলেছেন, ‘তখন মুসা নিজের মনে কিছুটা ভয় অনুভব করলেন।’ (সুরা : ত্বহা, আয়াত : ৬৭)
আর ইবরাহিম (আ.) সম্পর্কে বলেছেন, ‘তিনি তাদের থেকে মনে ভয় অনুভব করলেন।’ তারা বলল, ‘ভয় করবেন না। এবং তারা তাঁকে এক জ্ঞানী পুত্রের সুসংবাদ দিল।’ (সুরা : আয-যারিয়াত, আয়াত : ২৮)
তবে এই স্বাভাবিক ভয় সবার মধ্যে সমান মাত্রায় থাকে না। কারো ক্ষেত্রে এটি এমন মাত্রায় থাকে, যা তার মধ্যে চ্যালেঞ্জ গ্রহণের উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। এটি হলো ইতিবাচক ভয়। আবার কারো ক্ষেত্রে ভয় এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে সে পালিয়ে যাওয়া ও পিছিয়ে যাওয়াকেই বেছে নেয়। এটি হলো নেতিবাচক ভয়। এই ভয় বহু মানুষকে নিজের ও নিজের জাতির উপকার করা থেকে বিরত রেখেছে; কিন্তু এই ভয় যখন তার স্বাভাবিক সীমা অতিক্রম করে, তখন তা মানুষের জন্য এমন এক শৃঙ্খলে পরিণত হয়, যা তাকে বেঁধে ফেলে এবং তাকে পিছিয়ে যেতে ও আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করে।
ভয়ের তিনটি উৎস
ভয়ের প্রধান তিনটি উৎস আছে-
১. অতীত অভিজ্ঞতার ভয় : অতীতে ঘটে যাওয়া কোনো কষ্টকর অভিজ্ঞতা আমাদের ভীত করে তুলতে পারে। আমরা আশঙ্কা করি, একই ঘটনা আবার ঘটবে। তাই আমরা সেই পরিস্থিতি থেকে দূরে সরে যাই। যেমন-বৈদ্যুতিক তারের ভয়, উঁচু স্থান বা পাহাড়ের চূড়ার ভয়, গভীর খাদ বা বিপজ্জনক ঢালু স্থানের ভয়।
২. অজানার ভয় : যে বিষয় সম্পর্কে আমরা জানি না এবং যা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে—তার ভয়ও মানুষের মধ্যে থাকে। যেমন-অন্ধকারের ভয়, পরিত্যক্ত স্থান বা নির্জন জায়গার ভয়।
৩. সমালোচনা ও মানুষের কথার ভয় : অন্যরা কী বলবে, কিভাবে সমালোচনা করবে-এই ভয়ও মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে কাজ করে। প্রকৃতপক্ষে এমন কেউ নেই যে মানুষের সমালোচনা থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ।
ভয়ও আল্লাহর একটি নিয়ামত
সবকিছুর পরও মনে রাখতে হবে, ভয় আল্লাহর একটি নিয়ামত ও অনুগ্রহ। ভয়ের মাধ্যমে আমরা নিজেদের রক্ষা করি। ভয়ের মাধ্যমে আমরা বিপদ অনুভব করি, বিপদ থেকে পালিয়ে নিরাপদে ফিরে আসি। এটি আমাদের বেঁচে থাকার জন্য একটি শক্তি।
ভয়ের সঙ্গে অ্যাড্রেনালিন নামের একটি হরমোনের সম্পর্ক রয়েছে। মানুষ যখন কোনো অনিরাপদ পরিস্থিতি অনুভব করে, তখন মস্তিষ্কের নির্দেশে শরীরে এই হরমোন নিঃসৃত হয়। তাই নিজের মধ্যে এই উপকারী প্রাকৃতিক ব্যবস্থাটি থাকার জন্যও আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা উচিত।
ভয়ের কারণ অক্ষমতা নয়, অভিজ্ঞতার অভাব
ভয় ও দ্বিধার অন্যতম কারণ হলো অভিজ্ঞতার ঘাটতি; সামর্থ্যের ঘাটতি নয়। আমাদের প্রায় ৯০ শতাংশ ভয়ই নিছক কল্পনা ও ধারণা, যার বাস্তব অস্তিত্ব নেই; তা শুধু আমাদের মনের মধ্যেই থাকে। তাই ভয় ও পিছিয়ে পড়াকে পরাজিত করার একমাত্র উপায় হলো সাহস ও এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়।
মনে রাখতে হবে যে প্রতিটি সাফল্য এসেছে শেষ প্রচেষ্টায়। যে ব্যক্তি মাঝপথে ফিরে যায়, সে যদি জানতে পারত যে সাফল্য তার কতটা কাছে ছিল, তাহলে হয়তো সে কখনো হাল ছাড়ত না এবং চেষ্টা বন্ধ করত না।
যে হাঁটে, সে-ই হোঁচট খায়; যে বসে থাকে, সে কখনো হোঁচট খায় না। কিন্তু যে হাঁটছে, সে তার লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথে আছে। আর যে বসে আছে, সে কখনো নিজের জায়গা থেকে এগোতে পারবে না।
তবে এর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। সাধ্যের সবটুকু কাজে লাগাতে হবে। নিজের প্রতিটি সম্ভাবনা, শক্তি, প্রতিভা ও যোগ্যতাকে কাজে লাগাতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘আর যারা আমার পথে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়, আমি অবশ্যই তাদের আমার পথগুলো দেখাব। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৬৯)
বিডি প্রতিদিন