সিলেট-চারখাই-শেওলা সড়কে আশার আলো
এহিয়া আহমদ
দীর্ঘ দিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটলো সিলেট-চারখাই-শেওলা সড়কের চারলেন উন্নয়ন প্রকল্পে। নাজুক অবস্থার কারণে যাত্রী ও ব্যবসায়িক চলাচলে সমস্যার মধ্যে ফসকে থাকা এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটির উন্নয়ন কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। জেলা প্রশাসন, স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের যৌথ প্রচেষ্টায় সড়কটি আধুনিক আকারে গড়ে উঠার পথে এগোচ্ছে। যা শুধু যাত্রী চলাচল সহজ করবে না, বরং আঞ্চলিক ব্যবসা-বাণিজ্যকেও নতুন দিগন্ত খুলবে।
গত মঙ্গলবার ও বুধবার সিলেট জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ভূমি অধিগ্রহণ কার্যক্রম শুরু করে। প্রথম ধাপে বিয়ানীবাজার উপজেলার আলীনগর ও শেওলা ইউনিয়নের জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। যেহেতু সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে নাজুক অবস্থায় ছিল এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ও যাত্রী চলাচলে সমস্যা সৃষ্টি করত, তাই এই উদ্যোগে স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে।
এই দুই দিনে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে দায়িত্বপ্রাপ্তরা বিয়ানীবাজার উপজেলার আলীনগর ও শেওলা ইউনিয়নে চারলেন প্রকল্পের জরিপ ও ভূমি অধিগ্রহণ কাজ পরিচালনা করেন। প্রকৃত জমির মালিকদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজ যাচাই-বাছাই করে জমি অধিগ্রহণ করা হয় এবং মালিকদের সরকারি ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দিয়ে জমি ছেড়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়। স্থানীয় রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন ও ব্যবসায়িক নেতাদের সক্রিয় ভূমিকার কারণে পূর্বে বাতিল সুপারিশকৃত প্রকল্পটি পুনর্বিবেচনা করে জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম এই কাজ শুরু করার নির্দেশ দেন।
জানা যায়, জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমের প্রচেষ্টা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের চাপের ফলে পূর্ব সিলেটের চার উপজেলার জনমনে স্বস্তি ফিরে এসেছে। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সিলেট-৬ আসনের প্রার্থী এমরান আহমদ চৌধুরী এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির ও সিলেট-৬ আসনের প্রার্থী মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন প্রকল্প বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সিলেট থেকে শেওলা স্থলবন্দর পর্যন্ত যাত্রী ও পণ্যবাহী পরিবহন দ্রুত ও সহজ হবে। এছাড়াও বিবিআইএন করিডোর, সাসেক করিডোর, এশিয়ান হাইওয়ে, বিমসটেক করিডোর, বিসিআইএম করিডোর ও সার্ক করিডোরের সঙ্গে আঞ্চলিক সংযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যও বৃদ্ধি পাবে। প্রকল্পের আওতায় ২৪৭ একর জমি অধিগ্রহণ, প্রায় ৪৩ কিলোমিটার চার লেন সড়ক, দুটি সার্ভিস লেন, ৩১টি কালভার্ট, তিনটি সেতু, একটি ফ্লাইওভার, ছয়টি ওভারপাস, দুটি আন্ডারপাস, চারটি ফুটওভারব্রিজ, সাতটি পায়ে চলার রাস্তা এবং একটি টোল প্লাজা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, সিলেট থেকে শেওলা স্থলবন্দর পর্যন্ত এই প্রকল্প বাস্তবায়নে খরচ হবে ৪,২৫৭ কোটি ৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক ২,৮৮৬ কোটি ৮২ লাখ টাকা ঋণ হিসেবে দেবে, বাকি ১,৩৭০ কোটি ২৫ লাখ টাকা সরকার প্রদান করবে। পরামর্শক সেবার জন্য মোট ১০৯ কোটি ৯৩ লাখ টাকার বাজেট রাখা হয়েছে।
২০২৩ সালের ১১ এপ্রিল একনেক বৈঠকে অনুমোদিত প্রকল্পটির বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর। প্রধান লক্ষ্য হলো সিলেট থেকে শেওলা স্থলবন্দর পর্যন্ত যাত্রী ও পণ্যবাহী পরিবহন দ্রুত ও নিরাপদ করা। শেওলা স্থলবন্দর দিয়ে নিয়মিত ভারত-বাংলাদেশ পণ্য আমদানি-রপ্তানি হয়, বিশেষ করে পাথর, সিমেন্ট, ফলমূল এবং প্রাণ-সজীব পণ্য। ভরা মৌসুমে প্রায় প্রতিদিন ২০০টি ভারী ট্রাক চলাচল করে, যা বর্তমান শেওলা সেতুর নাজুক অবস্থার কারণে প্রায়ই আটকে যায়।
স্থানীয়রা মনে করেন, দীর্ঘদিনের জীর্ণ সড়কের সমস্যার সমাধান হিসেবে চারলেন সড়ক প্রকল্প পূর্ব সিলেটের চার উপজেলার জনজীবন এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। সড়কটি কার্যকর হলে মালামাল পরিবহন ও যাত্রী চলাচল আরও দ্রুত ও নিরাপদ হবে, ফলে স্থানীয় অর্থনীতি ও আঞ্চলিক বাণিজ্যে বড় প্রভাব পড়বে।
সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমরান আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘সিলেটের যাতায়াতের অন্যতম এই সড়কটির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। স্থানীয়দের দাবির প্রেক্ষিতে আমি জেলা প্রশাসকের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা করেছি। জেলা প্রশাসক আশ্বস্ত করেছিলেন প্রকল্পটি পুনরায় শুরু করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাবেন। সেই ধারাবাহিকতায় ভূমি অধিগ্রহণ কাজ শুরু হয়েছে, বাকি কাজও দ্রুত শুরু হবে।’
জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম সিলেটভিউকে জানান, ‘আমি সিলেট আসার পর থেকে রাজনৈতিক নেতা, সুশীল সমাজ ও স্থানীয়দের অনুরোধে এই প্রকল্প বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিয়েছি। সরকারের আন্তরিকতা ও জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় ইতিমধ্যেই প্রকল্পে অগ্রগতি হয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণ কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে অন্যান্য কাজও শুরু হবে।’
সিলেটভিউ২৪ডটকম