আর কয়েকটি প্রহর পরই জাতীয় নির্বাচন
ভোটের আগুনে ঈমান যেন না পোড়ে
মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা
আর কয়েকটি প্রহর পরই জাতীয় নির্বাচন। তাই নির্বাচনের উষ্ণ হাওয়ায় গোটা দেশ উত্তপ্ত। বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা নিজ নিজ প্রচারণায় ব্যস্ত। সবাই যার যার মতো করে জনগণকে নিজেদের দিকে আকৃষ্ট করতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে।
নির্বাচনের উৎসবমুখর পরিবেশে এটা স্বাভাবিক। তবে দুঃখের বিষয় হলো, দেশে কাগুজে সার্টিফিকেটধারী শিক্ষিত মানুষের হার আগের চেয়ে অনেক বাড়লেও বাস্তবে শিক্ষিত ও দায়িত্বশীল আচরণের অভাব সাধারণ জনগণকে হতাশ করছে।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ভিন্ন চিন্তার মানুষকে অপমান করার জন্য অমূলক ও মিথ্যা ছড়ানোর সেই পুরনো নিয়ম এখনো অনুসরণ করা হচ্ছে। অথচ বেশির ভাগ মানুষই মুসলমান।
শুধু চিন্তার পার্থক্যের কারণে মুসলমান হয়ে জেনেশুনে অপর মুসলমানকে অপমান ও তুচ্ছ করার জন্য নোংরা পথ অবলম্বন করছে। অথচ অন্যকে অমূলক কথা ছড়িয়ে অসম্মান করে বা বাকপটুতার আশ্রয় নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে সফল হওয়ার নীতি মুনাফিকদের। তারা মহানবী (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামকে কষ্ট দিতে এসব পদ্ধতি অবলম্বন করত।
কোনো মুসলমান অপর মুসলমানের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রপাগান্ডা ছড়াতে পারে না।
এটা মুসলমানের জন্য অবৈধ। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আর যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে তাদের কৃত কোনো অন্যায় ছাড়াই কষ্ট দেয়, নিশ্চয় তারা বহন করবে অপবাদ ও সুস্পষ্ট পাপ।’ (আহজাব, আয়াত : ৫৮)
আয়াত দ্বারা কোনো মুসলিমকে শরিয়তসম্মত কারণ ব্যতিরেকে কষ্টদানের অবৈধতা প্রমাণিত হয়েছে। (ফাতহুল কাদির)
মহানবী (সা.) এই অপরাধের মাত্রাকে সুদের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ইসলামের দৃষ্টিতে সুদ গ্রহণ সবচেয়ে নিকৃষ্টতম পাপগুলোর একটি।
সাঈদ ইবনে জায়েদ (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেন, অন্যায়ভাবে কোনো মুসলিমের মানসম্মানে হস্তক্ষেপ করা ব্যাপকতর সুদের অন্তর্ভুক্ত (মহাপাপ)।
(সুনানে আবু দাউদ : ৪৮৭৬)
অর্থাৎ কোনো বৈধ অধিকার ছাড়া শুধু হিংসা-বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে কথা বা কাজের মাধ্যমে কোনো মুসলিমের ইজ্জত-সম্মানে আঘাত করা; যেমন—গিবত করা, কটু ও নিন্দনীয় কথা বলা কিংবা শরিয়তসম্মত কোনো কারণ ছাড়াই নিজের ভাইয়ের সম্মানকে হালাল মনে করা এবং তার প্রাপ্যের চেয়েও বেশি মাত্রায় কথা বা কাজে আক্রমণ করা জঘন্যতম অপরাধ। সুতরাং সম্মানে আঘাত করা সম্পদের সুদের চেয়েও অধিক ক্ষতিকর ও ভয়াবহ।
সর্বদা অন্যের পেছনে লেগে, তাদের বিরুদ্ধে অমূলক তথ্য ছড়িয়ে, প্রপাগান্ডা করে, তাদের বিভিন্ন মহলে অসম্মান করে হয়তো সাময়িক কিছু অর্থ-সম্পদ বা পদ-পদবি বাগিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু এর পরিণতি ভয়ংকর। কারণ মহান আল্লাহ ক্ষেত্রবিশেষে সাময়িক ছাড় দিলেও ছেড়ে দেন না। তিনি প্রতিটি কাজের হিসাব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নেবেন। আর মানুষের সম্মান নষ্ট করা তো আরো ভয়াবহ বিষয়। আবদুল্লাহ বিন আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে কাবাঘর তাওয়াফ করতে দেখলাম এবং তিনি বলছিলেন, কত উত্তম তুমি হে কাবা! আকর্ষণীয় তোমার খোশবু, কত উচ্চ মর্যাদা তোমার (হে কাবা)! কত মহান সম্মান তোমার। সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে মুহাম্মদের প্রাণ! আল্লাহর কাছে মুমিন ব্যক্তির জান-মাল ও ইজ্জতের মর্যাদা তোমার চেয়ে অনেক বেশি। আমরা মুমিন ব্যক্তি সম্পর্কে সুধারণাই পোষণ করি।’ (ইবনে মাজাহ : ৩৯৩২)
সুবহানাল্লাহ, মহান আল্লাহ তাঁর বান্দার সম্মানের ব্যাপারে কত যত্নবান! কিন্তু আমরা সামান্য কিছু পদ-পদবি, অর্থ-সম্পদ হাতিয়ে নেওয়ার লোভে জেনেশুনে মানুষের সম্মান হরণে পিছপা হই না। বরং কেউ কেউ তো এসব মিথ্যাচার ও তাচ্ছিল্যের ক্ষমতা নিয়ে বড়াই করে। অথচ এই বাকপটুতা, চতুরতা ঈমানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, জাহান্নামের আগুনকে প্রজ্বলিত করে। এসব অভ্যাস মানুষকে প্রকৃত মুসলমানের কাতার থেকে বের করে দেয়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যার জিহ্বা ও হাত থেকে মুসলিমরা নিরাপদ থাকে সে ব্যক্তিই প্রকৃত মুসলিম। আর যাকে মানুষ তাদের জান ও মালের জন্য নিরাপদ মনে করে সে-ই প্রকৃত মুমিন। (তিরমিজি, হাদিস : ২৬২৭)
নির্বাচন করে অনেক জায়গায় সহিংসতা হতেও দেখা যাচ্ছে। এক মুসলমান আরেক মুসলমানের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করছে—এটাও মুসলিম সমাজের জন্য লজ্জার। কেননা পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আর যে ইচ্ছাকৃত কোনো মুমিনকে হত্যা করবে, তার প্রতিদান হচ্ছে জাহান্নাম, সেখানে সে স্থায়ী হবে। আর আল্লাহ তার ওপর ক্রুদ্ধ হবেন, তাকে লানত করবেন এবং তার জন্য বিশাল আজাব প্রস্তুত করে রাখবেন।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৯৩)
মহানবী (সা.) এ ব্যাপারে সতর্ক করে বলেছেন, ইবনে সিরিন (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবু হুরায়রা (রা.)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আবুল কাসিম (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের প্রতি (লৌহনির্মিত) মারণাস্ত্র দ্বারা ইঙ্গিত করে সে তা পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত ফেরেশতারা তাকে অভিসম্পাত করতে থাকে যদিও সে তার আপন ভাই হয়।
(মুসলিম, হাদিস : ৬৫৬০)
নাউজুবিল্লাহ, অপর হাদিসে তো আরো ভয়াবহ সতর্কবার্তা এসেছে। মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আমাদের ওপর (কোনো মুসলমানের ওপর) অস্ত্র উত্তোলন করবে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়। (বুখারি, হাদিস : ৭০৭১)
অতএব আমাদের উচিত, মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় এক উম্মত হয়ে থাকা। ঈমানের প্রশ্নে, ইসলামের প্রশ্নে এবং দেশের উন্নয়নের প্রশ্নে সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকা। ইসলামিক ও রাজনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রাখা।
বিডি প্রতিদিন