• সিলেট, সকাল ৯:২৮, ১২ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

শবেবরাতের তাৎপর্য

admin
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ১, ২০২৬
শবেবরাতের তাৎপর্য

Manual2 Ad Code

শবেবরাতের তাৎপর্য

মুফতি রফিকুল ইসলাম আল মাদানি

 

ইসলামি জীবনব্যবস্থায় কিছু সময় ও কিছু রাত রয়েছে, যেগুলো কেবল সময়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয় বরং আধ্যাত্মিকভাবে মানুষের জীবনপ্রবাহকে প্রভাবিত করে। শাবানের পনেরোতম রজনি, যা ‘শবেবরাত’ নামে পরিচিত, তেমনই এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ রাত। এটি রহমত ও মাগফিরাতের প্রতীক, আবার আত্মসমালোচনা ও তাকদির-সংশোধনের এক মহাসন্ধিক্ষণ, ভাগ্যরজনি।

‘বরাত’ শব্দটি আরবি ‘বারাআহ’ ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ মুক্তি, নিষ্কৃতি বা দায়মুক্তি। এই দৃষ্টিকোণ থেকে শবেবরাত হলো গুনাহ থেকে মুক্তি, জাহান্নাম থেকে অব্যাহতি এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের রাত। যুগে যুগে মুসলিম মনীষীরা এই রাতকে মানবজীবনের নৈতিক ও আত্মিক সংস্কারের এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ হিসেবে বিবেচনা করে এসেছেন।

পবিত্র কোরআনে সরাসরি ‘শবেবরাত’ শব্দটি না থাকলেও সুরা আদ-দুখানে হয়েছে : ‘নিশ্চয়ই আমি তা নাজিল করেছি এক বরকতময় রাতে। সেই রাতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত হয়’ (সুরা আদ-দুখান: ৩-৪)

Manual1 Ad Code

তাফসিরবিদদের মধ্যে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় মতভেদ রয়েছে। বহু প্রখ্যাত তাবেয়ি ও মুফাসসির শাবানের মধ্যরাতের সঙ্গে এর সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছেন। মতভেদের কারণ ও সমাধান বিশ্লেষণের চূড়ান্ত হলো, এই আয়াতে শবেবরাতকে বরকতময় রজনি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে তা পরিষ্কার। এ ছাড়া শবেবরাতের ফজিলত হাদিস দ্বারা সুপ্রতিষ্ঠিত।

হাদিসে রসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহতায়ালা শাবানের মধ্যরাতে সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান, বায়হাকি) হাদিসবিশারদ নির্ভরযোগ্য সব উলামায়ে কেরামের গবেষণা মতে এই হাদিসটি ‘সহিহ’ বিশুদ্ধ।

Manual6 Ad Code

আরব বিশ্বের শ্রেষ্ঠ গবেষক ও মান্যবর ইমাম হাফেজ নূরুদ্দীন হায়সামী (রহ.) লেখেন, হাদিসের বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য। (মাজমাউয যাওয়াইদ) আল্লামা নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহ.) লেখেন, হাদিসটি সহিহ, সাহাবায়ে কেরামের বিশাল অংশ বিভিন্ন সনদে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন, যা একটি অপরটিকে সুদৃঢ় করে।

তাঁরা হলেন- মুআয ইবনে জাবাল, আবু সালাবা আল খুশানি, আবদুল্লাহ ইবনে আমর, আবু মুসা আশআরি, আবু হুরায়রা, আবু বকর ছিদ্দিক, আউফ ইবনে মালেক ও আয়েশা (রা.)। তিনি ৮টি হাদিস উল্লেখ করার পর আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিস প্রসঙ্গে আলোচনায় শবেবরাত সম্পর্কীয় যাবতীয় হাদিসের মৌলিকভাবে মান বর্ণনা করেছেন।

তিনি লেখেন, ‘শবেবরাত সম্পর্কীয় হাদিসের ক্ষেত্রে সারকথা হলো, শবেবরাত সম্পর্কে বর্ণিত হাদিসগুলো সমষ্টিগতভাবে নিঃসন্দেহে ‘সহিহ’। হাদিস অত্যধিক দুর্বল না হলে আরও কমসংখ্যক সূত্রে বর্ণিত হাদিস সহিহ হিসেবে গণ্য হয়। (সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহিহ)। এই হাদিস শবেবরাতের মৌলিক দর্শন স্পষ্ট করে দেয়-এ রাত কেবল ইবাদতের নয়, বরং হৃদয়ের পরিশুদ্ধতার রাত।

Manual2 Ad Code

হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার ও সম্পর্কচ্ছেদের মতো আত্মিক ব্যাধি ক্ষমা লাভের পথে প্রধান অন্তরায়। তাই শবেবরাত আত্মশুদ্ধির আহ্বান জানায় আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক সংশোধনের পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের। শবেবরাত তাকদিরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি রাত।

বহু আলেমের মতে, এ রাতে আগামী এক বছরের জন্য মানুষের জীবনমৃত্যু, রিজিক, সুখদুঃখের ফয়সালা ফেরেশতাদের কাছে অর্পিত হয়। যদিও চূড়ান্ত তাকদির আল্লাহর জ্ঞানেই সংরক্ষিত, তবু দোয়া ও তওবার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর অনুগ্রহ আকর্ষণ করতে পারে-এটাই ইসলামের আশাবাদী দর্শন। এই রজনির মৌলিক আমল হলো, দীর্ঘ ইবাদত, দোয়া ও কান্নাভেজা মোনাজাতেরত থাকা। শবেবরাতের রাত জাগরণ ও পরদিন রোজা রাখা-উভয়ই নফল ইবাদত হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। শবেবরাতকে ঘিরে শরিয়ত অনুমোদিত আমল ও লোকাচারভিত্তিক চর্চার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য করা জরুরি।

আতশবাজি, আলোকসজ্জা, উচ্চ শব্দে আনন্দ প্রকাশ কিংবা নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে বাধ্যতামূলক নামাজ আদায়-এসবের কোনো ভিত্তি কোরআন-হাদিসে নেই। বরং এগুলো এই রাতের নিরবচ্ছিন্ন ভাবগাম্ভীর্য ও আত্মিক আবহকে ব্যাহত করে। শবেবরাত আমাদের শেখায় ইসলাম আনুষ্ঠানিকতার ধর্ম নয়, বরং অন্তরের পরিবর্তনের ধর্ম। এ রাত আত্মজিজ্ঞাসার রাত। আমি কেমন মানুষ? আমার উপার্জন কতটা হালাল? আমার সম্পর্কগুলো কতটা ন্যায়ভিত্তিক? আমার ইবাদত কি কেবল অভ্যাস, নাকি আল্লাহপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ?-এই প্রশ্নগুলোই শবেবরাতের প্রকৃত পাঠ।

Manual4 Ad Code

পরিশেষে বলা যায়, শবেবরাত কোনো উৎসবমুখর রাত নয়; এটি নীরব আত্মসংস্কারের রাত। গুনাহের অন্ধকার থেকে আলোয় ফিরে আসার রাত। তাকদিরের দরজায় করুণা ভিক্ষা করার রাত। যদি এই রাতে মানুষ সত্যিকার অর্থে আত্মশুদ্ধির পথে এক কদমও অগ্রসর হয়, তবে শবেবরাত তার জীবনে বাস্তব মুক্তির সূচনা হয়ে উঠতে পারে।

লেখক : গবেষক, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বসুন্ধরা, ঢাকা

 

বিডি প্রতিদিন

Latif Travels
Metropolitan University

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন

📞 মোবাইল: +8801712540420

✉️ ইমেইল: pavel.syl@gmail.com