বাহ্যিক সাজসজ্জা মানুষের মর্যাদার মানদণ্ড নয়
মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা
আমাদের সমাজে দেখা যায়, মানুষকে তার বাহ্যিক চাকচিক্য, পোশাক-পরিচ্ছদ, ধন-সম্পদ বা পদ-পদবি দিয়ে বিচার করা হয়। কোনো আচার-অনুষ্ঠান, সেবাগ্রহণ কিংবা কেনাকাটা করতে গেলে সেখানে উল্লিখিত বিষয়গুলোর ভিত্তিতে মানুষকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। অথচ ইসলাম মানুষের বাহ্যিক চাকচিক্য, পোশাক-পরিচ্ছদ, ধন-সম্পদ বা পদ-পদবি দিয়ে মানুষকে বিচার করার প্রবণতাকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহ করেছে। মহান আল্লাহ মানুষের মর্যাদার ভিত্তি নির্ধারণ করে দিয়েছেন।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘হে মানুষ, আমি তোমাদের এক নারী ও এক পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছি আর তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি; যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়াসম্পন্ন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তো সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১৩)
এই আয়াত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, মানুষের মর্যাদার মাপকাঠি হলো তাকওয়া, ধন-সম্পদ বা বাহ্যিক রূপ নয়।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘হে লোক সকল! শোনো, তোমাদের প্রতিপালক এক, তোমাদের পিতা এক। শোনো, আরবির ওপর অনারবির এবং অনারবির ওপর আরবির, কৃষ্ণকায়ের ওপর শ্বেতকায়ের এবং শ্বেতকায়ের ওপর কৃষ্ণকায়ের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা নেই। শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা আছে তো শুধু তাকওয়ার কারণে।’ (মুসনাদে আহমাদ)
আজকের সমাজে প্রায়ই দেখা যায়-দামি পোশাক, ব্র্যান্ডেড জুতা, বিলাসবহুল গাড়ি কিংবা উচ্চ পদমর্যাদা থাকলে মানুষকে বিশেষ সম্মান দেওয়া হয়।
অথচ একজন সৎ, আল্লাহভীরু কিন্তু সাধারণ পোশাক পরিহিত মানুষকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয় না। আবার অনেক ক্ষেত্রে উল্টোভাবে ইসলামী পোশাক বা দ্বিনি পরিচয়ের কারণেও কাউকে অবমূল্যায়ন করা হয়। কেউ টুপি, পাঞ্জাবি, দাড়ি বা শরয়ি পর্দা মেনে চললে তাকে ‘ব্যাকডেটেড’, ‘কম আধুনিক’ বা ‘অযোগ্য’ মনে করা হয়। অথচ বাস্তবে তিনি হয়তো উচ্চশিক্ষিত, বড় পদমর্যাদার অধিকারী কিংবা সমাজে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা ব্যক্তি। ইসলাম এই দুই ধরনের মানসিকতাকেই প্রত্যাখ্যান করেছে।
কারণ মানুষকে বাহ্যিক স্টাইল বা পোশাক দিয়ে বিচার করা যেমন ভুল, তেমনি আল্লাহর বিধান মানার কারণে কাউকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করাও গুরুতর অন্যায়, কখনো কখনো ঈমানের জন্যও হুমকি।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘হে ঈমানদাররা, কোনো সম্প্রদায় যেন অপর কোনো সম্প্রদায়কে বিদ্রুপ না করে, হতে পারে তারা বিদ্রুপকারীদের চেয়ে উত্তম। আর কোনো নারীও যেন অন্য নারীকে বিদ্রুপ না করে, হতে পারে তারা বিদ্রুপকারীদের চেয়ে উত্তম। আর তোমরা একে অপরের নিন্দা কোরো না এবং তোমরা একে অপরকে মন্দ উপনামে ডেকো না। ঈমানের পর মন্দ নাম কতই না নিকৃষ্ট! আর যারা তাওবা করে না, তারাই তো জালিম।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১১)
অর্থাৎ যাকে মানুষ পোশাক, সামাজিক অবস্থান বা বাহ্যিক চেহারা দেখে সাধারণ মনে করছে, আল্লাহর কাছে সেই হয়তো অধিক মর্যাদাবান হতে পারে। দুনিয়ার ক্ষেত্রেও সে বাস্তবে বহু বড় ব্যক্তিত্ব হতে পারে। আবার কোনো বড় ব্যক্তিত্বকে শুধু ইসলামী পোশাক পরিধান ও ইসলামী রীতিনীতি পালনের কারণে যদি জেনেশুনে অবজ্ঞা করা হয় বা কৌশলে তাকে অপমান করা হয়, তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়, তাহলে তা ঈমানকেও হুমকির মুখে ফেলে দিতে পারে। কারণ সেখানে ব্যক্তিকে নয়, বরং ইসলামকে অবজ্ঞা করা হয়। আর পবিত্র কোরআনে এ ব্যাপারে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আপনি তাদের প্রশ্ন করলে অবশ্যই তারা বলবে, আমরা তো আলাপ-আলোচনা ও খেল-তামাশা করছিলাম। বলুন, তোমরা কি আল্লাহ, তার আয়াতসমূহ ও তার রাসুলকে বিদ্রুপ করছিলে? তোমরা এখন অজুহাত দেখিয়ো না, তোমরা তো ঈমান আনার পর কুফরি করেছ, যদিও আমি তোমাদের মধ্য থেকে কতককে ক্ষমা করে দিই, তবু কতককে শাস্তি দেবই। কারণ তারা অপরাধী ছিল।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৬৫-৬৬)
আবার কাউকে অর্থ-সম্পদ কম বলে অবজ্ঞা বা তুচ্ছ করার সুযোগ নেই। কুরাইশ নেতাদের চাহিদা ছিল, মহানবী (সা.) দরিদ্র সাহাবিদের দূরে সরিয়ে তাদের অভিজাত লোকদের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করুক, কিন্তু মহান আল্লাহ তা পছন্দ করেননি; বরং আয়াত নাজিল করে, তাদের এই অন্যায় আবদার না রাখার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যেসব লোক সকাল-সন্ধ্যায় তাদের রবের ইবাদত করে এবং এর মাধ্যমে তাঁর সন্তুষ্টিই কামনা করে, তাদের তুমি দূরে সরিয়ে দেবে না, তাদের হিসাব-নিকাশের কোনো কিছুর দায়িত্ব তোমার ওপর নয় এবং তোমার হিসাব-নিকাশের কোনো কিছুর দায়িত্বও তাদের ওপর নয়। এর পরও যদি তুমি তাদের দূরে সরিয়ে দাও তাহলে তুমি জালিমদের মধ্যে শামিল হয়ে যাবে।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ৫২)
অতএব, সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে ধনী-গরিব বিবেচনা নয়; বরং যার হক, তাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। ঘরোয়া অনুষ্ঠান বা আত্মীয় ও বন্ধুমহলে কাউকে গুরুত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে অর্থ-সম্পদ ও বাহ্যিক বেশভূষাকে প্রাধান্য দিয়ে অন্যদের তুচ্ছ করা যাবে না। নিছক দ্বিনি পোশাক পরিধান কিংবা ইসলামী পরিচয়ের কারণে কাউকে অবমূল্যায়ন করা যাবে না।
রাখতে হবে, মানুষের মর্যাদা নির্ধারণ করতে হবে তার চরিত্র, আমানতদারি, দ্বিনদারি, মানবিকতা ও তাকওয়ার ভিত্তিতে। কারণ টাকা, ক্ষমতা, পদ-পদবি, ফ্যাশন ও বাহ্যিক সৌন্দর্য-সবই ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু তাকওয়া ও সৎ আমলই মানুষের প্রকৃত মর্যাদা নির্ধারণ করে, দুনিয়াতেও, আখিরাতেও।
বিডি প্রতিদিন