ইসলাম মানবমর্যাদা, নিরাপত্তা ও পবিত্রতার ধর্ম
বালিকার প্রতি সহিংসতাকারীর বিরুদ্ধে মহানবীর কঠোর পদক্ষেপ
মাইমুনা আক্তার
ইসলাম মানবমর্যাদা, নিরাপত্তা ও পবিত্রতার ধর্ম। নারী, শিশু, দুর্বল ও নির্যাতিত মানুষের অধিকার রক্ষাকে ইসলাম অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। কোনো নারী বা শিশুর ওপর জুলুম, নির্যাতন, যৌন সহিংসতা কিংবা ধর্ষণ শুধু সামাজিক অপরাধ নয়; ইসলামের দৃষ্টিতে এটি ভয়াবহ গুনাহ, ফাসাদ ও মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্য অপরাধ।
পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর পৃথিবীতে বিপর্যয় ও অনাচার সৃষ্টি করতে চেয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অনাচারীদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা : কাসাস, আয়াত : ৭৭)
পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি যেমন জঘন্য অপরাধ, তার শাস্তিও বেশ কঠিন। পবিত্র কোরআনে ফাসাদ সৃষ্টিকারীদের শাস্তির ব্যাপারে বলা হয়েছে, ‘যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে আর জমিনে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে বেড়ায় তাদের শাস্তি হলো এই যে তাদেরকে হত্যা করা হবে অথবা ক্রুশবিদ্ধ করা হবে অথবা তাদের হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কেটে ফেলা হবে, অথবা তাদেরকে দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে। এ হলো তাদের জন্য দুনিয়াতে লাঞ্ছনা, আর তাদের জন্য আখিরাতে রয়েছে মহাশাস্তি। (সুরা : মায়েদা, আয়াত : ৩৩)
এই আয়াত অবতীর্ণের কারণ এই যে উকল বা উরাইনা গোত্রের কিছু লোক মুসলমান হয়ে মদিনায় আগমন করে এবং মদিনার আবহাওয়া তাদের স্বাস্থ্যের প্রতিকূল হয়। অতঃপর মহানবী (সা.) তাদের মদিনার বাইরে যেখানে সদকার উট ছিল সেখানে পাঠিয়ে দেন, সেখানে তারা উটের প্রস্রাব ও দুধ পান করবে, তাতে আল্লাহ আরোগ্যদান করবেন।
সুতরাং কিছু দিনের মধ্যেই তাদের অসুখ ভালো হয়ে গেল। কিন্তু তারপর তারা উটের রাখালকে মেরে ফেলল এবং উটগুলো হাঁকিয়ে নিয়ে চলে গেল। যখন রাসুল (সা.)-এর নিকট এ সংবাদ পৌঁছাল, তখন তিনি সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-কে তাদের পশ্চাদ্ধাবন করে তাদেরকে উটসহ ধরে আনার নির্দেশ দিলেন। (অতঃপর তাদেরকে পাকড়াও করে রাসুল (সা.)-এর সামনে পেশ করা হলো।) মহানবী (সা.) তাদের হাত-পা কেটে ফেলা এবং চোখে গরম শলাকা ফিরানোর নির্দেশ দিলেন। (কেননা তারাও রাখালদের সঙ্গে অনুরূপ আচরণ করেছিল।) অতঃপর তাদেরকে রৌদ্রে রাখা হলো, ফলে তারা ধড়ফড় করে মৃত্যুবরণ করল।
সহিহ বুখারিতে এই শব্দসহ বর্ণিত হয়েছে যে তারা চুরিও করেছিল, হত্যাও করেছিল, ঈমান আনার পর কুফরিও করেছিল, আর আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধও করেছিল। (তাফসিরে আহসানুল বয়ান)
এই ঘটনায় স্পষ্ট হয় যে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ইসলামের অবস্থান খুবই কঠোর। যারা সমাজে বা রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে, ইসলাম তাদের কঠোর হস্তে প্রতিরোধ করার নির্দেশ দেয়। ব্যভিচার, ধর্ষণ, ডাকাতির মতো অপরাধগুলোতে ইসলাম এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান রেখেছে, যা অন্যদের এই পাপ করার ব্যাপারে সতর্ক হতে বাধ্য করে। এক শ বেত্রাঘাত, পাথর ছুড়ে হত্যার কঠিন বিধানগুলো তার বাস্তব প্রমাণ।
এ ছাড়া অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী অন্যান্য শাস্তির বিধান তো রয়েছেই। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, জনৈক ইহুদি এক বালিকার রুপার অলংকার কেড়ে নিল এবং পরে তাকে দুটি পাথরের মাঝে রেখে তার মাথা চূর্ণ করল। লোকজন এসে দেখল, তার নিঃশ্বাস তখনো অবশিষ্ট রয়েছে।
লোকজন তাকে জিজ্ঞেস করতে লাগল : তোমাকে কি ওই ব্যক্তি মেরেছে? ওই ব্যক্তি মেরেছে? অবশেষে ওই ইহুদির নাম আসতেই সে বলল : হ্যাঁ। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদেশে তার মাথা দুটি পাথরের মাঝখানে রেখে চূর্ণ করে দেওয়া হয়। (নাসায়ি, হাদিস : ৪৭৪১)
বর্তমান যুগেও যদি কোনো রাষ্ট্র প্রকৃত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারে, তাহলে এসব অপরাধ অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশা করা যায়। পাশাপাশি মানুষের মধ্যে নৈতিকতা, ঈমান, পারিবারিক শিক্ষা ও আল্লাহভীতির সংকট দূরীকরণেও কাজ করতে হবে। কারণ যার মধ্যে ঈমান ও আল্লাহর ভয় নেই, তার দ্বারা যেকোনো পাপ করা সম্ভব।
বিডি প্রতিদিন