সাংবাদিক তুরাব স্মৃতি পদক পেলেন কাদের তাপাদার
প্রেসবিজ্ঞপ্তি
সিলেটের ইতিহাসে প্রথম পুলিশের গুলিতে নিহত তরুণ সাংবাদিক, দৈনিক নয়া দিগন্ত ও দৈনিক জালালাবাদের তৎকালীন রিপোর্টার এটিএম তুরাবের স্মৃতি রক্ষার্থে সিলেট প্রেসক্লাব প্রবর্তিত সাংবাদিক এটিএম তুরাব স্মৃতি পদকে এ বছর ভূষিত হয়েছেন দৈনিক নয়া দিগন্তের সিলেট ব্যুরোচিফ আবদুল কাদের তাপাদার।
শনিবার বিকেলে সিলেট প্রেসক্লাবে আয়োজিত আলোচনা সভা ও পদক প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে পদক ও সম্মাণনার অর্থ পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিকের হাতে তিনি তুলে দেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।
সিলেট প্রেসক্লাব সভাপতি মুকতাবিস উন নূরের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সিলেট -৬ আসনের সংসদ সদস্য আ্যডভোকেট এমরান আহমেদ চৌধুরী, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সিলেট মহানগর জামায়াতের আমীর মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, সিলেটও মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসাইন চৌধুরী ও সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক( সার্বিক) সাঈদা পারভীন।
এসময় প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, জুলাই আন্দোলনে শহীদ এটিএম তুরাব আমাদের সকলের প্রেরণার উৎস। এ হত্যার সাথে জড়িত সকলকে বিচারের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। তুরাব হত্যার বিষয়ে সংসদে সরকারি ও বিরোধীদলকে সোচ্চার হবার পরামর্শ দেন তিনি।
পুলিশের গুলিতে নির্মমভাবে নিহত সাংবাদিক এটিএম তুরাবের দ্বিতীয় শাহাদাতবার্ষিকীতে এসময় আলোচনা সভারও আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, জুলাই আন্দোলনে দেড় হাজার মানুষের রক্তের বিনিময়ে আমরা এ জায়গায় এসেছি। শহীদ তুরাবের রক্ত সিলেটের মাটিতে ঝরেছে। তুরাব হত্যার বিচার বিলম্বিত হবার বিষয়ে আলোকপাত করে তিনি বলেন, এ নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে তিনি আগামী ২/৩ দিনের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলবেন। যাতে তুরাবসহ এ ধরনের জঘন্য হত্যাকান্ডের সাথে জড়িতরা দ্রুত গ্রেফতার হয় এবং তাদের উপযুক্ত শাস্তি হয়।
এমপি এমরান আহমদ চৌধুরী বলেন, তুরাবের লাশ ছিনিয়ে নেয়ার অপচেষ্টার স্বাক্ষী আমরা। মামলায় আমাদের লোকজনকেও আসামি করা হয়। এটা হচ্ছে নির্মম বাস্তবতা। জুলাই বিপ্লবে তুরাব ও গোলাপগঞ্জের ৭ জন নিরীহ মানুষকে হত্যার অগ্রগতি নিয়ে তিনি সম্প্রতি চিফ প্রসিকিউটরের সাথে আলোচনা করেছেন। এ হত্যাকান্ডের বিলম্বে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমরা প্রতিশোধপরায়ণ হতে চাই না। এ হত্যার বিচারের মধ্য দিয়ে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে-এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান লোদী (কয়েস লোদী) তুরাব হত্যার বিচার কার্যক্রম তুরাব হত্যাকান্ডের তদন্ত প্রক্রিয়া সাগর রুনি হত্যাকান্ডের মতো হয়ে যায় কিনা-এই আশংকা ব্যক্ত করেন। এ হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত পুলিশ অফিসাররা গ্রেফতার না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘প্রতিবাদ নয়, ফাঁসির দাবি নিয়ে আমরা দাঁড়িয়েছি’।
মহানগর জামায়াতের আমীর ফখরুল ইসলাম বলেন, সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে তুরাব জীবন দিয়েছেন। এ মামলার তেমন অগ্রগতি না হওয়ায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ হোসেন চৌধুরী বলেছেন এ সরকার কোন অন্যায়কে ছাড় দেবে না।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সাঈদা পারভীন বলেন, রাজনীতির কারণে কারো রক্ত ঝরুক-এটা আমরা চাই না।
এছাড়াও বক্তব্য রাখেন, বক্তব্য রাখেন-ক্লাবের সাবেক সভাপতি ইকবাল সিদ্দিকী ও ইকরামুল কবির, সিনিয়র সহ-সভাপতি এম এ হান্নান, সিলেট মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মোহাম্মদ বদরুদ্দোজা বদর, সাবেক কোষাধ্যক্ষ কবীর আহমদ সোহেল, ক্লাবের সহ-সাধারণ সম্পাদক খালেদ আহমদ, ফটো জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হুমায়ুন কবির লিটন। শুরুতে পবিত্র কুরআন থেকে তেলাওয়াত করেন ক্লাব সদস্য কবির আহমদ। পরে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক আবদুল কাদের তাপাদারের হাতে ক্রেস্ট ও সম্মাননা তুলে দেন প্রধান অতিথিসহ অন্য অতিথিবৃন্দ।
ক্লাবের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন-ক্রীড়া ও সংস্কৃতি সম্পাদক শেখ আশরাফুল আলম নাসির, পাঠাগার ও প্রকাশনা সম্পাদক মো. মুহিবুর রহমান, কার্যনির্বাহী সদস্য আমজাদ হোসাইন ও আনাস হাবিব কলিন্স।
ক্লাব সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন-জিয়াউস-শামস শাহীন, হুমায়ূন রশিদ চৌধুরী, সেলিম আউয়াল, মো. আমিরুল ইসলাম চৌধুরী (এহিয়া), কবির আহমদ, আশকার ইবনে আমিন লস্কর রাব্বী, জাবেদ আহমদ, আহবাব মোস্তফা খান, মো. বদরুর রহমান বাবর, শুয়াইবুল ইসলাম, নৌসাদ আহমদ চৌধুরী, মুনশী ইকবাল, শেখ আব্দুল মজিদ, মো. দুলাল হোসেন, মো. মারুফ হাসান, লুৎফুর রহমান তোফায়েল, এম রহমান ফারুক, শফিক আহমদ শফি, মামুন পারভেজ, লবীব আহমদ, মো. জুনেদ আহমদ, আব্দুল হান্নান, লোকমান আহমদ, সহযোগী সদস্য আকাশ চৌধুরী প্রমুখ। সভাপতির বক্তব্যে মুকতাবিস উন নূর বলেন, একটি পক্ষ এই হত্যা মামলার আসামীদের রক্ষার জন্য শুরুতেই তৎপর ছিল। তুরাবের পরিবার যেন ইনসাফ পায়-তিনি সেই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
পদকপ্রাপ্ত সিনিয়র সাংবাদিক আবদুল কাদের তাপাদার সিলেটে সাড়ে ৩ দশক ধরে বিভিন্ন সাড়া জাগানো রিপোর্টের কারণে আলোচিত।
অনুসন্ধানী রিপোর্টের কারণে তিনি বহু বার মামলার আসামি হয়েছেন।
# ডেটলাইন ১৯ জুলাই ২০২৪ : যেভাবে গুলি করে হত্যা করা হয় সাংবাদিক তুরাবকে
১৯ জুলাই শুক্রবার জুমুয়ার নামাজ শেষ হতেই সিলেটে মিছিল বের করে বিএনপি ও সমমনা কয়েকটি দল। মিছিলে কোনো উত্তেজনা নেই। পরিস্থিতি শান্ত ও স্বাভাবিক। নিত্যদিনের মতো সাংবাদিকরা সেখানে উপস্থিত হন। নগরের প্রাণকেন্দ্র বন্দরবাজার এলাকায় অতিক্রম করছিল বিশাল মিছিল, পাশেই পুলিশের সশস্ত্র অবস্থান। হঠাৎই অতি উৎসাহী পুলিশ কর্মকর্তা এসএমপির তৎকালীন এডিসি সাদেক কাউসার দস্তগীর ও ডিসি আজহাবার আলী শেখ এর মারমুখী আচরণে বদলে যায় পরিস্থিতি। উতপ্ত হয়ে উঠে সিলেটের বন্দরবাজার কোর্ট পয়েন্ট এলাকা। তখন পুলিশের কিলিং মিশনের টার্গেটে পড়ে যান সাংবাদিক এ টি এম তুরাব। দৈনিক নয়া দিগন্ত ও দৈনিক জালালাবাদের মাঠ কাঁপানো রিপোর্টার এ টি এম তুরাব মিছিলের সময় সড়কের রেলিংয়ে এক হাত দিয়ে ধরে অন্য হাতের মোবাইল ক্যামেরায় শরীরে প্রেস লেখা জ্যাকেট (ভেস্ট) হেলমেট পড়ে বিএনপির মিছিল ও পুলিশের অবস্থানের মাঝখানে ভিডিও ধারণ করছিলেন। এমন সময় হঠাৎই বিগড়ে যান ভয়ঙ্কর এডিসি দস্তগীর।
একজন কনস্টেবলের হাত থেকে বন্দুক নিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি ছোঁড়া শুরু করেন তিনি। তার গুলির নিশানা সাংবাদিক তুরাব। এ সময় সেখানে ছিলেন এসএমপির আরেক ভয়ঙ্কর পুলিশ কর্মকর্তা ডিসি আজবাহার আলী শেখ। দস্তগীরের দেখাদেখি উপস্থিত সব পুলিশ সদস্য বৃষ্টির মতো গুলি ছোড়েন। তাদের গুলিতে গুরুতর জখম হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন সাংবাদিক এ টি এম তুরাব। কয়েকজন পথচারী আশঙ্কাজনক অবস্থায় তুরাবকে রিকশায় তুলে ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। এ সময় খবর পান কয়েকজন সহকর্মী। নিত্যদিনের সহকর্মী দৈনিক জালালাবাদের ফটোগ্রাফার হুমায়ুন কবির লিটনসহ অন্যান্য সহকর্মীরা ছুটে যান ওসমানী হাসপাতালে। সেখানে তার শারীরিক অবনতি হলে তাকে জরুরি ভিত্তিতে সোবহানীঘাট ইবনে সিনা হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে আইসিইউতে থাকাবস্থায় সাংবাদিক তুরাব সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। তুরাবের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ও সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা: শামসুল ইসলাম জানান, তুরাবের শরীরে ৯৮টি গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। গুলিতে তার লিভার ও ফুসফুস মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত হয়। মাথায়ও মারাত্মক আঘাতের চিহ্ন ছিল। তুরাব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সেদিনে সিলেটসহ পুরো বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে উঠে। অনেক জায়গায় পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়, আহত হয় অনেকেই।