বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে ‘অকুপেশনাল থেরাপি’ শিক্ষার্থীদের সচেতনতামূলক উদ্যোগ
প্রেস বিজ্ঞপ্তি
কুলাউড়ায় তিন দিনের জরিপে ১৩৮ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি শনাক্ত, বিদ্যালয়ে মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মসূচি মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করেছেন বাংলাদেশ হেলথ প্রফেশনস ইনস্টিটিউটের (বিএইচপিআই) অকুপেশনাল থেরাপি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা।
তিন দিন ধরে চালানো জরিপে তাঁরা ১৩৮ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে শনাক্ত করেছেন। পাশাপাশি প্রতিবন্ধিতা ও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হিঙ্গাজিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নিয়ে আয়োজন করেছেন বিশেষ কর্মসূচি।
পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্রের (সিআরপি) একাডেমিক প্রতিষ্ঠান বিএইচপিআইয়ের অকুপেশনাল থেরাপি বিভাগের শিক্ষার্থীরা কুলাউড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় জরিপ চালিয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, প্রতিবন্ধিতার ঝুঁকিতে থাকা মানুষ এবং দৈনন্দিন কাজ করতে সমস্যার মুখোমুখি হওয়া ব্যক্তিদের শনাক্ত করেন। পরে তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী অকুপেশনাল থেরাপি সেবা দেওয়া হচ্ছে।
অকুপেশনাল থেরাপি একটি বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসাপদ্ধতি। এর মাধ্যমে একজন মানুষকে নিজের যত্ন নেওয়া, পড়াশোনা, কাজ, বিনোদন ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যতটা সম্ভব স্বনির্ভরভাবে অংশ নিতে সহায়তা করা হয়। এর লক্ষ্য দৈনন্দিন কাজে সক্ষমতা বাড়ানো, জীবনযাত্রার মান উন্নত করা এবং সামাজিক অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা।
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে হিঙ্গাজিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে আয়োজিত সচেতনতামূলক কর্মসূচির প্রতিপাদ্য ছিল, ‘জীবনের অভিজ্ঞতা শুনি: সত্যিকারের কথা, সত্যিকারের পরিবর্তন’। অকুপেশনাল থেরাপি বিভাগের প্রভাষক মো. আজিম হোসেন ও দিশা বিশ্বাসের সার্বিক তত্ত্বাবধানে কর্মসূচিটি অনুষ্ঠিত হয়।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (এনআইএমএইচ) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) কারিগরি সহায়তায় পরিচালিত ২০১৮-২০১৯ সালের জাতীয় জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৮ থেকে ৯৯ বছর বয়সী মানুষের প্রায় ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। ৭ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে এ হার ১২ দশমিক ৬ শতাংশ। নারীদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার হার ২১ দশমিক ৫ শতাংশ, পুরুষদের ক্ষেত্রে ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ৯২ দশমিক ৩ শতাংশ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত। শিশুদের ক্ষেত্রে এ হার প্রায় ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ। এসব পরিসংখ্যান মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতন করতে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ভিত্তিক কর্মসূচিটি আয়োজন করেন। এ বয়সে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের পাশাপাশি সামাজিক চাপ এবং নানা আবেগীয় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। এ সময় মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সঠিক ধারণা তৈরি হলে ভবিষ্যতে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব বলে মনে করেন আয়োজকেরা।
কর্মসূচিতে মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার গুরুত্ব, মানসিক সমস্যার প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করা, মানসিক চাপ মোকাবিলা, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং প্রয়োজন হলে উপযুক্ত পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করা হয়। পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে প্রচলিত কুসংস্কার, ভুল ধারণা ও নেতিবাচক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি দূর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
অকুপেশনাল থেরাপি বিভাগের শিক্ষার্থীরা বলেন, শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক সুস্থতাও মানুষের দৈনন্দিন জীবন, শিক্ষা, কর্মক্ষমতা, সামাজিক সম্পর্ক ও সামগ্রিক জীবনমানের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
তিন দিনের জরিপে শনাক্ত হওয়া ১৩৮ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিলেন স্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তি, ৩৪ দশমিক ৮ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা, ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ। এ ছাড়া অস্টিওআর্থ্রাইটিস বা পেশি ও অস্থিসংক্রান্ত সমস্যায় আক্রান্ত ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধিতা রয়েছে এমন ৬ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়। বাকিরা অন্যান্য রোগ ও সমস্যায় আক্রান্ত।
আয়োজকদের মতে, এই জরিপ কমিউনিটি পর্যায়ে পুনর্বাসনসেবা ও অকুপেশনাল থেরাপির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের মধ্যে প্রতিবন্ধিতা ও মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দৈনন্দিন কাজ ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আয়োজকেরা বলেন, প্রতিবন্ধিতা বা মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা কোনো মানুষের জীবনের সমাপ্তি নয়। উপযুক্ত পুনর্বাসন, প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা পেলে একজন মানুষ আবারও নিজের প্রয়োজনীয় ও অর্থবহ কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে পারেন। এ ক্ষেত্রে কমিউনিটিভিত্তিক পুনর্বাসন এবং অকুপেশনাল থেরাপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।