• সিলেট, ভোর ৫:১২, ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

হাদিস ইসলামী শরিয়তের দ্বিতীয় উৎস ও দলিল

admin
প্রকাশিত ডিসেম্বর ১৩, ২০২৫
হাদিস ইসলামী শরিয়তের দ্বিতীয় উৎস ও দলিল

Manual2 Ad Code

হাদিস ইসলামী শরিয়তের দ্বিতীয় উৎস ও দলিল

মুফতি মাহমুদ হাসান

 

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস ও সুন্নত কোরআনে কারিমের পর ইসলামী শরিয়তের দ্বিতীয় উৎস ও দলিল। এটি মুসলিম উম্মাহর হাজার বছরব্যাপী ঐকমত্যপূর্ণ বিষয়, এতে কেউ দ্বিমত করেনি। হ্যাঁ, বর্ণনাসূত্রের সবলতা ও দুর্বলতার কারণে তার প্রামাণিকতার স্তর নির্ণীত হয়ে থাকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে প্রমাণিত কোনো হাদিস ও সুন্নতের অগ্রহণযোগ্যতার ব্যাপারে মত দেওয়ার কেউ দুঃসাহস করেননি।

কেননা হাদিস ও সুন্নতের অস্বীকার প্রকারান্তরে কোরআনের অস্বীকার। বলাবাহুল্য যে যাঁর মাধ্যমে কোরআন পেলাম, তাঁর কথা ও কাজ যদি গ্রহণযোগ্য না হয়, তাহলে তাঁর আনীত কোরআন কিভাবে বিশ্বাস করতে পারি।

Manual4 Ad Code

কোরআনের মর্ম ও উদ্দেশ্য এবং তার বিধানগুলোর যে ব্যাখ্যা আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসুল (সা.)-কে শিখিয়েছেন সেই ব্যাখ্যা আমাদের কাছে পৌঁছেছে হাদিস ও সুন্নতের মাধ্যমে। কোরআনের নির্দেশ, শব্দ, ইশারা ও বিশেষ পরিভাষার যে প্রকৃত অর্থ নবী (সা.)-কে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যদি তা কোরআনের ভেতরেই সম্পূর্ণভাবে লিপিবদ্ধ থাকত, তবে আলাদা করে আল্লাহ তাআলা বলতেন না—‘এর ব্যাখ্যা দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। (সুরা : কিয়ামাহ, আয়াত : ১৯)

Manual3 Ad Code

কারণ সে ক্ষেত্রে সবকিছু কোরআনের মধ্যেই পাওয়া যেত। এতে প্রমাণিত হয়, কোরআনের গভীর অর্থ ও ব্যাখ্যা নবী (সা.) কোরআনের শব্দের বাইরে আরো ব্যাখ্যার মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।

হাদিস অস্বীকারের নেপথ্য কারণ

যারা হাদিস অস্বীকার করে তাদের সব চেষ্টা এক জায়গায় যেকোনোভাবে হাদিসকে সরিয়ে দেওয়া, যাতে কোরআন সম্পর্কে তাদের ইচ্ছামতো ব্যাখ্যা দেওয়ার পথ তৈরি হয়। মূলত যারা সুন্নতকে অস্বীকার করে, তারা শুধু কোরআনের শব্দকে গ্রহণ করে; কিন্তু সেই শব্দের প্রকৃত উদ্দেশ্য বোঝার বদলে নিজের ইচ্ছামতো ব্যাখ্যা করে।

তাই দেখা যায়, খারেজি, মুতাজিলা, বাতেনি, কাদিয়ানি ইত্যাদি যত মতবাদভিত্তিক বিভ্রান্তি আছে, তাদের প্রত্যেকেই কোরআনকে নিজেদের দাবির ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেছে। আর কোরআন তখনই বিভ্রান্তির হাতিয়ার হয়ে ওঠে, যখন তার প্রকৃত ব্যাখ্যা অর্থাৎ সুন্নত অস্বীকার করা হয়। তখন শুধু শব্দ থাকে, আর সেই শব্দ নিয়ে যে কেউ নিজের মতো করে খেলা খেলতে পারে। পর্যালোচনায় দেখা যায় যে পশ্চিমা ‘প্রাচ্যবাদী আন্দোলন’ ইসলামের ওপর যে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রশ্ন করে থাকে, তার মূলভিত্তি সেই পুরনো নকশার ওপর দাঁড়ানো, যা একসময় মুতাজিলা ও খারেজিরা গ্রহণ করেছিল অর্থাৎ কোরআনকে সুন্নত, সাহাবাদের আমল ও উম্মাহর ধারাবাহিক ব্যাখ্যা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া, যাতে তা থেকে ইচ্ছামতো ব্যাখ্যা তৈরি করা যায়।
নামধারী আহলে কোরআনের উৎপত্তি ও বিকাশ

গত শতক থেকে কিছু লোক অজানা উদ্দেশ্যে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসের অগ্রহণযোগ্যতার আলোচনা ওঠায় এবং শুধু কোরআন মানার স্লোগান ওঠায়।

Manual5 Ad Code

এটি সর্বসম্মতিক্রমে একটি ভ্রান্ত ও কুফরি মতাদর্শ। হাদিস অস্বীকারের প্রবণতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মুসলিম দুনিয়ায় এটির মূল সূচনা প্রায় ২০০ বছর আগে, খ্রিস্টান প্রাচ্যবিদদের হাত ধরে। এর আগে ইসলামী ইতিহাসে কখনো কখনো ভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতে এর আভাস পাওয়া যায়, কিন্তু এত ব্যাপক ও পরিকল্পিতভাবে এবং আলাদা মতবাদ হিসেবে কখনো দেখা যায়নি।
কোরআনের পর হাদিস ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস; তাই প্রাচ্যবিদরা এ উেসর প্রতি বিশেষ আগ্রহ দেখিয়েছে এবং ‘স্বাধীন গবেষণা’ ও ‘একাডেমিক সমালোচনা’র নামে বিষোদ্গার করেছে। এ ধারায় দুজন প্রাচ্যবিদ সবচেয়ে বেশি পরিচিত :

এক. ইগনাজ গোল্ডজিহার, জার্মান বংশোদ্ভূত ইহুদি। তিনি ইসলামী সূত্রগুলো গভীরভাবে অধ্যয়ন করে ১৮৯০ সালে প্রথম গবেষণা প্রকাশ করেন, যেখানে তিনি প্রায় সব ইসলামী দলিল-সূত্রকে সন্দেহজনক করে দেখানোর চেষ্টা করেন।

দুই. জোসেফ শাখট, তিনি বিশেষভাবে ‘ইসলামী ফিকহ’ নিয়ে কাজ করেন এবং বহু ছোট-বড় প্রবন্ধ লেখেন। তিনি ইসলামী সব সূত্রকে অগ্রহণযোগ্য বলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন।

উপরোক্ত প্রাচ্যবিদদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েই মুসলিম নামধারী একদল বুদ্ধিজীবী তাঁদের মতো কথা বলা শুরু করেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন তুর্কি বুদ্ধিজীবী জিয়া গোক আল্প (১৮৭৫-১৯২৪)। তিনি ইসলামী বিশ্বে মডার্নিজমের প্রথম সক্রিয় প্রচারক ছিলেন। উসমানি খিলাফত পতনের সময় তুর্কি জাতীয়তাবাদের উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। মিসরে ছিলেন ত্বহা হুসাইনসহ তাঁর কিছু ভক্ত-অনুরক্ত। ভারত উপমহাদেশে ছিল গোলাম আহমাদ পারভেজ, আব্দুল্লাহ চকরালবি, আমির আলীসহ কিছু লোক।

Manual7 Ad Code

এসব হাদিস অস্বীকারকারীদের অভিযোগ হলো, হাদিস তৃতীয় হিজরি শতকে সংগ্রহ হয়েছে; এগুলো উমাইয়া আমলে বানানো; এগুলো অনারবিদের ষড়যন্ত্র; এগুলো বুদ্ধিবিরোধী ইত্যাদি। আসলে তাদের এসব অভিযোগই প্রাচ্যবিদদের থেকেই সংগৃহীত কথাবার্তা।

হাদিস অস্বীকারের পরিণতি হলো ধর্মত্যাগ

আসল কথা হলো, ধর্মীয় কাঠামো নতুনভাবে সাজাতে হলে পুরনো ধর্মীয় ঐতিহ্য ভেঙে দিতে হয়; আর সে বিদ্রোহ সফল হলে মুসলমানদের তাদের অতীত থেকে বিচ্ছিন্ন করে নতুন রূপ দেওয়া সহজ হয়ে যায়। ঠিক এটাই ঘটল। হাদিসকে মানদণ্ড না রাখার ফলে কোরআনের ব্যাখ্যার অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই চিন্তাবিদদের হাতে চলে গেল; এরপর তারা কোরআনের ধারণা-অর্থকে যেদিকে ইচ্ছা টেনে নিল।

এ কারণেই দেখা যায় গোলাম আহমদ পারভেজ কোরআনের সুপরিচিত ও ধারাবাহিক ব্যাখ্যাকে পরিবর্তন করে আল্লাহ, রাসুল, কলেমা, নামাজ, জাকাত, রোজা, হজ ইত্যাদি শব্দের এমন অর্থ দাঁড় করালেন, যা নবীযুগ থেকে আজ পর্যন্ত মুসলমানদের প্রচলিত ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত।

তাঁর মতে, ‘আল্লাহ’ ও ‘রাসুল’ বলতে বুঝায় রাষ্ট্রীয় কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব, জান্নাত-জাহান্নাম বলতে বুঝায় মানুষের অভ্যন্তরীণ অবস্থা, আর নামাজ, রোজা, জাকাত, হজ, এসব শুধু হিন্দু ধর্মের পূজা, উপবাস, দান, তীর্থযাত্রার সমতুল্য। (দেখুন—কোরআনি ফয়সালা, পৃষ্ঠা-৩০১-৩০২)

এই লোকেরা তাদের অনুসারীদের ইসলামী শরিয়ত থেকে বিচ্ছিন্ন করল, কিন্তু তাদেরকে কোরআন থেকেও কোনো সুস্পষ্ট, শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি কিংবা বিকল্প ব্যবস্থা দিতে পারল না। ফলস্বরূপ তাদের অনুসারীরা দ্রুত ধর্মহীনতার সারিতে যোগ দিল। অর্থাৎ এই হাদিস অস্বীকার যা দেখে মনে হয় কোরআন ও বুদ্ধির কথা, আসলে তার শেষ গন্তব্য হলো নাস্তিকতা।

রাসুলুল্লাহ (সা.) দেড় হাজার বছর আগে আমাদের এ বিষয়ে সতর্ক করে গিয়েছিলেন। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘তোমাদের মধ্য থেকে এমন যেন কেউ না হয়, আরামদায়ক চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে রইল, এমতাবস্থায় তার কাছে আমার কোনো আদেশ-নিষেধের বাণী পৌঁছল, আর সে বলল, আমি এসব চিনি না, বরং আমি শুধু কোরআনে যা পাবো তা-ই মানব।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৬০৫)

এটি মূলত এই হাদিস অস্বীকারকারী তথাকথিত আহলে কোরআনের প্রতিই ইঙ্গিত করে। এই হাদিসে শুধু কোরআন মানার দাবি করে হাদিস অস্বীকারকারীকে কঠিন সতর্ক করা হয়েছে।

বিডি প্রতিদিন

Latif Travels
Metropolitan University

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন

📞 মোবাইল: +8801712540420

✉️ ইমেইল: pavel.syl@gmail.com