• সিলেট, দুপুর ১:৫২, ১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ইসলামে আখিরাতমুখী চেতনাই মুখ্য

admin
প্রকাশিত জানুয়ারি ৫, ২০২৬
ইসলামে আখিরাতমুখী চেতনাই মুখ্য

Manual5 Ad Code

ইসলামে আখিরাতমুখী চেতনাই মুখ্য
মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ

 

ইসলামের প্রধানতম স্বভাব বৈশিষ্ট্য হলো আখিরাতমুখী চেতনাবোধ। এই দুনিয়া চিরস্থায়ী নয়, খুবই সীমিত তার সময়। এর সুখ-দুঃখ, লাভ-ক্ষতি, বিত্ত-বৈভব, ক্ষমতা ও শক্তি, ইজ্জত-সম্মান, অসম্মান কোনো কিছু স্থায়ী নয়। পাহাড়-পর্বত, আকাশ-জমিন, নদী-সমুদ্র, বন-বনানী সবকিছু যাবে ধ্বংস হয়ে।

Manual3 Ad Code

সারাক্ষণ এর মধ্যে পরিবর্তন ঘটছে। একটা পরিবর্তন আরেকটা ধ্বংসের জানান দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। এই মানুষও মরণশীল। মরণেই কি তার সব শেষ? না, আখিরাতের এক চিরস্থায়ী জীবন তার জন্য অপেক্ষা করছে।

সেখানে সুখ হলে, সে সুখের শেষ নেই; আর কষ্টের জীবন হলে, সে কষ্টেরও কোনো শেষ নেই। অনন্তকাল ভুগতে হবে তাতে।

এই জগৎ, এই পৃথিবী, এই সময়কাল, এই সীমিত জীবনপরিধি হলো আখিরাতের শস্যক্ষেত্র। এখান থেকেই আখিরাত কামাই করে নিতে হবে।

শস্য বুনবে এখানে, আর ভোগ করবে আখিরাতে। ঈমান ও আমল, সৎ ও নেককাজ হলো এর বীজ। নেক আমল করে যে সুখ-শান্তি ভোগের বীজ বুনবে এখানে, সে ফলে-ফসলে প্রাপ্ত হবে আখিরাতে, জান্নাতে। সুখময়তার শেষ হবে না কখনো। কোরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে, ‘আখিরাত হলো উত্তম এবং চিরস্থায়ী।’ (সুরা : আল আলা, আয়াত : ১৭)

পক্ষান্তরে এ জমিন যদি কেউ কর্ষণ না করে, চাষাবাদ না করে, নেককাজের বীজ না বুনে, তবে ক্ষতিকর আগাছা-পরগাছায় কণ্টকাকীর্ণ হয়ে যাবে, বিষধর সব পোকামাকড় জন্তু-জানোয়ারের আবাসে পরিণত হবে তা। এর নিদারুণ নির্মম পরিণামও একজনকে ভোগ করতে হবে আখিরাতে, জাহান্নামে। এর নির্মম কষ্ট, এর অসহনীয় যাতনারও শেষ নেই, অন্ত নেই। ইরশাদ হচ্ছে, ‘এতেই তাদের বসবাস করতে হবে চিরকাল, চিরস্থায়ী হবে সেখানে তারা।’

সর্বযুগের নবী-রাসুলরা বলেছেন, দুনিয়া ভোগের জায়গা নয়, ভোগের জায়গা হলো আখিরাত, জান্নাত বা জাহান্নাম। রাসুল (সা.) সব কাজে এই আখিরাতমুখিতায় উম্মতকে গড়ে তোলার প্রয়াস পেয়েছেন। কোনোরূপ হীনম্মন্যতার সম্মুখীন না হয়ে স্পষ্ট ও একান্ত জোড়ালোভাবে তুলে ধরেছেন আখিরাতের পুরস্কার অথবা শাস্তির কথা। এতে কোনো রাখঢাক ছিল না তাঁর।

আকাবার দ্বিতীয় শপথের সময় মদিনার আনসারি সাহাবিদের সঙ্গে যখন হিজরতের আলোচনা চূড়ান্ত হচ্ছিল, মুহূর্তটি ছিল খুবই নাজুক। সমাজনায়ক হোক বা সমরনায়ক, লোকরঞ্জন নেতা হোক বা ভাগ্যান্বেষী সর্দার যে কেউ এখানে এসে স্খলিতপদ হয়ে যেত, ছিটকে পড়ত তার পথ থেকে। কিন্তু স্ফীতবক্ষ, দৃঢ়চিত্ত, আল্লাহনির্ভর, নিঃশঙ্ক-হৃদয় রাসুল (সা.) পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেছিলেন নিজেকে, পরিণতি ও পরিণামকে।

ইসলামের আগেও হজের প্রচলন ছিল। ইয়াসরিব অর্থাৎ মদিনার আওস ও খাজরাজ গোত্রের কিছু লোক তখন হজ করতে আসেন। এরা সংখ্যায় ছিল ৭২ জন পুরুষ ও দুজন নারী। মিনায় এক গিরিখাতের কাছে তাঁরা রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। রাসুল (সা.) হজের সময় মিনায় ইসলামের দাওয়াত দিতেন। আগের বছরও মদিনার ১২ জনের একটি দলের সঙ্গে রাসুল (সা.)-এর সাক্ষাৎ হয়েছিল এখানেই, তাঁরাই এই ৭২ জনকে নিয়ে এসেছিলেন। তাঁরা ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মদিনায় হিজরত করার আহবান জানান তাঁকে।

সর্বতোভাবে নিজেদের পরিবার-পরিজনের মতো রাসুল (সা.)-এর হেফাজত ও নিরাপত্তা দানের অঙ্গীকার করেন।

Manual6 Ad Code

এ সময় কেউ কেউ তাঁদের সতর্ক করে এর কঠিন পরিণামের কথা ভেবে দেখার হুঁশিয়ারিও দিয়েছিলেন যে এই অঙ্গীকার হচ্ছে সারা মুশরিক আরবের দুশমনি যেচে বরণ করার নামান্তর। উপস্থিত আনসারিরাও এর ভীষণ আশঙ্কাজনক পরিণাম সম্পর্কে জানতেন। সব আশঙ্কা ও বিপদ মাথায় নিয়েও তাঁরা বললেন, আমাদের ধনসম্পদের সমূহ ক্ষতি, আমাদের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হত্যার আশঙ্কা সামনে রেখেই সবকিছু জেনেশুনে আমরা এই অঙ্গীকার করছি।

শেষে তাঁরা রাসুল (সা.)-এর কাছে আরজ করলেন, হে রাসুল, আমরা যদি আমাদের অঙ্গীকার পূরণ করি, তবে আমরা কী পাবো?

কী ভীষণ নাজুক মুহূর্ত! একদিকে আপন জ্ঞাতিগোষ্ঠীর হাতে নির্যাতিত রাসুল (সা.)-এর বহুদিন পর পাওয়া আশ্রয় আশা, আরেক দিকে ইহুদি বেনিয়াদের হাতে উত্পীড়িত-নিপীড়িত মদিনার আনসারীদের বাঁচার আকুতি, আগামী দিনের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা। আল্লাহর রাসুল (সা.) দুনিয়ার কোনো লাভের কথা না বলে জলদগম্ভীর কণ্ঠে ছোট্ট করে বললেন, ‘জান্নাত’।

দুনিয়ার কিছু নয়, জাগতিক কোনো আশ্বাস নয়, আখিরাতকেই তিনি মুখ্য করে তুলে ধরলেন তাঁদের সামনে, আর সৌভাগ্যবান ইয়াসরিববাসীরা জান্নাতের বিপুল আশ্বাসময় প্রত্যয় নিয়ে ফিরে গেলেন মদিনায়। পৃথিবী দেখেছে, জান-মাল, ইজ্জত, স্ত্রী-পুত্র-কন্যা, পরিজন সবকিছু তাঁরা অকাতরে কোরবান করেছেন এই অঙ্গীকার রক্ষায়, জান্নাত ছাড়া আর কিছুই চাননি তাঁরা। পরবর্তী সময়ে খলিফারা, এমনকি রাসুল (সা.) নিজেও তাঁদের দিতে চেয়েছেন অনেক কিছু; কিন্তু আখিরাতই ছিল তাঁদের মুখ্য।

আখিরাতমুখী মানসিকতা গঠনের প্রতি রাসুল (সা.) সব সময় লক্ষ রাখতেন। এক জিহাদের পর সাহাবিরা সেখানে ক্রয়-বিক্রয় করছিলেন। জনৈক সাহাবির এই ব্যবসায়ে খুব লাভ হয়। তিনি খুশি মুখে রাসুল (সা.)-কে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, আজকে আমার অনেক লাভ হয়েছে। এত অল্প সময়ে এত লাভ আর কেউ করতে পারেনি। রাসুল (সা.) বলেন, কত? সাহাবি বললেন, ৩০০ উকিয়া রৌপ্যমুদ্রা।

রাসুল (সা.) বললেন, এর চেয়ে উত্তম লাভ অর্জনের কথা কি বলব? শোনো, ফরজ নামাজ আদায় করে দুই রাকাত নফল যদি আদায় করো তবে তা এর চেয়ে অনেক বেশি উত্তম।

নবীকন্যা, আদরের দুলালী ফাতিমা (রা.)-কে নিজের হাতেই সব কাজ করতে হতো। আলী (রা.) বলেন, চাক্কি পিষার দরুণ ফাতিমার হাতে কড়া পড়ে গিয়েছিল, মশক ভরে পানি আনতে আনতে বুকে মশকের রশির দাগ পড়ে গিয়েছিল, ঘরবাড়ি ঝাড়ু দিতে গিয়ে কাপড়চোপড় ময়লা হয়ে যেত। একবার রাসুল (সা.)-এর কাছে কিছু খাদেম এলে আমি তাকে বললাম, ‘একজন খাদেম চেয়ে আনো। এতে তোমার কিছু লাঘব হবে।’ তিনি গিয়ে দেখেন রাসুল (সা.)-এর কাছে অনেক মানুষ। কিছুই না বলে চলে এলেন। পরদিন রাসুল (সা.) নিজেই এলেন। বললেন, ফাতিমা, কী দরকারে গিয়েছিলে? লজ্জায় ফাতিমা (রা.) কিছুই বলতে পারলেন না। আলী (রা.) বলেন, আমি তখন সবিস্তার সব কথা বললাম। রাসুল (সা.) বললেন, ‘ফাতিমা, আল্লাহকে ভয় করতে থাকো, ফরজ বিষয়গুলো সমাধা করতে থাকো, নিজের হাতেই ঘরের কাজ করতে থাকো।’ অন্য এক বর্ণনায় আছে, আমি কি তোমাকে খাদেম বা চাকরবাকরের চেয়েও উত্তম বিষয় বলব? শোনো, শয়নের সময় ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ, ৩৪ বার আল্লাহু আকবার পাঠ করবে। এই তাসবিহগুলো খাদেমের চেয়ে অনেক উত্তম। ফাতিমা (রা.) বললেন, ‘আমি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ওপর সন্তুষ্ট।’

(ইমাম বুখারি, আস-সহিহ, হাদিস : ৫০৪৭)

কল্পনা করা যায়, এই ছিল দোজাহানের বাদশাহ নবী (সা.)-এর প্রিয় দুহিতা, আদরের-সোহাগের দুলালীর অবস্থা। কিভাবে রাসুল (সা.) তাঁকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে আমলমুখী করেছেন, আখিরাতমুখী করেছেন।

একান্ত যৌনতার বিষয়কেও, প্রবৃত্তির বিষয়ের ক্ষেত্রেও রাসুল (সা.) এই উম্মাহকে আখিরাতমুখী হওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন। এক হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, স্ত্রীর মুখে সোহাগভরে খাবার তুলে দেওয়ায়ও সদকা করার সওয়াব রয়েছে। (ইমাম বুখারি, আস-সহিহ, হাদিস : ৫৬)

Manual8 Ad Code

শুধু যৌন আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয় না, সদকার মতো সওয়াবও এতে নিহিত রয়েছে।

Manual5 Ad Code

তিনি সব সময়ই উম্মাহকে গড়তে গিয়ে ‘গায়রুল্লাহ’ থেকে আল্লাহর দিকে; জাগতিক উপকরণের প্রতি মুখাপেক্ষী হওয়ার চেয়ে নেক আমলের দিকে এবং দুনিয়া থেকে আখিরাতের চেতনার দিকে ধাবিত করতে প্রয়াস চালিয়ে গেছেন।

বিডি-প্রতিদিন/

Latif Travels
Metropolitan University

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন

📞 মোবাইল: +8801712540420

✉️ ইমেইল: pavel.syl@gmail.com