• সিলেট, সকাল ৬:৩৫, ২০শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

অনর্থক তর্ক এড়িয়ে চলাই ইসলামের রীতি

admin
প্রকাশিত জানুয়ারি ১৫, ২০২৬
অনর্থক তর্ক এড়িয়ে চলাই ইসলামের রীতি

Manual5 Ad Code

অনর্থক তর্ক এড়িয়ে চলাই ইসলামের রীতি

Manual8 Ad Code

প্রফেসর ড. আবু সালেহ মুহাম্মদ তোহা

 

মানুষ সামাজিক জীব হিসেবে মতভেদ ও দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য তার স্বভাবজাত বিষয়। কিন্তু এই মতভেদ যখন শালীনতা, সংযম ও নৈতিকতার সীমা অতিক্রম করে অহেতুক তর্কবিতর্কে রূপ নেয়, তখন তা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। ইসলাম এ ধরনের অনর্থক তর্ককে কঠোরভাবে নিরুৎসাহ করেছে। অযথা বিতর্ক অন্তরের বিভেদ সৃষ্টি করে, ভ্রাতৃত্ব নষ্ট করে এবং পূর্ববর্তী বহু জাতির ধ্বংসের কারণ হয়েছে।

তাই ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে তর্কের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সত্য অন্বেষণ ও সংশোধন, আত্মপ্রতিষ্ঠা বা জেদ প্রদর্শন নয়।

অযথা তর্কে লিপ্ত হওয়া নিন্দনীয় : অহেতুক ও অযথা তর্কে লিপ্ত হওয়া পুরোপুরি নিন্দনীয় কাজ। সমাজ ও ধর্ম-কোনো দৃষ্টিকোণ থেকেই কখনো অহেতুক তর্কে লিপ্ত হওয়া ঠিক নয়। এতে অন্তরের বিভেদ সৃষ্টি হয়, ভ্রাতৃত্ব নষ্ট হয় এবং একটি জাতি ধ্বংসের কারণ হয়।

আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি এক ব্যক্তিকে একটি আয়াত পড়তে শুনলাম। অথচ আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে (আয়াতটি) অন্যরূপ পড়তে শুনেছি। আমি তার হাত ধরে তাকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে নিয়ে এলাম। তিনি বললেন, তোমরা উভয়েই ঠিক পড়েছ।

শুবা (রহ.) বলেন, আমার মনে হয়, তিনি বলেছিলেন, ‘তোমরা বাদানুবাদ কোরো না। কেননা তোমাদের পূর্ববর্তীরা বাদানুবাদ করে ধ্বংস হয়েছে।’ (বুখারি, হাদিস : ২২৫০)

আবু মাসউদ আল-আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, ‘তোমরা পরস্পরের বিরোধিতা কোরো না; তাহলে তোমাদের অন্তরগুলো বিভক্ত হয়ে যাবে।’ (মুসলিম, হাদিস : ৮৫৮)

Manual7 Ad Code

অসার তর্কবিতর্ক আল্লাহর অপছন্দনীয় : মুশরিকরা নবী (সা.)-এর পবিত্র জবানে ঈসা (আ.)-এর সুনাম শুনে অসার তর্কবিতর্কে লিপ্ত হতো। তারা বলত-যদি ঈসা (আ.) প্রশংসার যোগ্য হন অথচ খ্রিস্টানরা তাঁকে উপাস্য বানিয়েছে, তাহলে আমাদের উপাস্যগুলো নিন্দিত হয় কিভাবে? এরাও কি উত্তম নয়? কিংবা আমাদের উপাস্যগুলো যদি জাহান্নামে যায়, তাহলে ঈসা (আ.) ও উযায়ের (আ.) জাহান্নামে যাবেন।

তাদের এসব যুক্তিতর্ক ও শোরগোল করা বিতর্ক ছাড়া কিছুই নয়। তারা নিজেদের মত বহাল রাখার জন্য অযথা কথা-কাটাকাটি করে। তাদের এসব দ্বন্দ্ব-কলহকে মহান আল্লাহ অপছন্দনীয়ভাবে প্রকাশ করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘এবং বলে, আমাদের দেবতাগুলো শ্রেষ্ঠ, না ঈসা? তারা কেবল বাগিবতণ্ডার উদ্দেশ্যেই আপনাকে এ কথা বলে, বস্তুত এরা তো এক বিতণ্ডাকারী সম্প্রদায়।’ (সুরা : জুখরুফ, আয়াত : ৫৮) আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অপছন্দনীয় হলো সেই ব্যক্তি, যে অতিমাত্রায় ঝগড়াটে ও বাগিবতণ্ডাকারী।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৬৭৩)

বিতর্ক এড়িয়ে চলা ব্যক্তির জন্য জান্নাত : অনর্থক বিতর্ক এড়িয়ে চলা ব্যক্তির জন্য নবী (সা.) জান্নাতের দায়িত্ব নিয়েছেন। আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ন্যায়সংগত হওয়া সত্ত্বেও ঝগড়া পরিহার করবে আমি তার জন্য জান্নাতের বেষ্টনীর মধ্যে একটি ঘরের জিম্মাদার; আর যে ব্যক্তি তামাশার ছলেও মিথ্যা বলবে না আমি তার জন্য জান্নাতের মাঝখানে একটি ঘরের জিম্মাদার আর যে ব্যক্তি তার চরিত্রকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছে আমি তার জন্য জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে অবস্থিত একটি ঘরের জিম্মাদার।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮০০)

প্রয়োজনে সদ্ভাবে বিতর্ক করা : প্রতিপক্ষের কঠোর কথাবার্তার জবাব নম্র ভাষায়, ক্রোধের জবাব সহনশীলতার সঙ্গে এবং মূর্খতাসুলভ হট্টগোলের জবাব গাম্ভীর্যপূর্ণ কথাবার্তার মাধ্যমে দেওয়া যায়। প্রয়োজন হলে বিতর্ক ও আলাপ-আলোচনা করা যায় উপযুক্ত যুক্তি-প্রমাণ সহকারে, ভদ্র ও শালীন ভাষায় এবং বুঝবার ও বোঝাবার ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে। আল্লাহ বলেন, ‘তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে দাওয়াত দাও হিকমত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সঙ্গে বিতর্ক করো সদ্ভাবে; নিশ্চয়ই তোমার রব, তাঁর পথ ছেড়ে কে বিপথগামী হয়েছে, সে সম্পর্কে বেশি জানেন এবং কারা সৎপথে আছে তা-ও তিনি খুব ভালোভাবেই জানেন।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ১২৫)

Manual7 Ad Code

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘আর তোমরা উত্তম পন্থা ছাড়া আহলে কিতাবদের সঙ্গে বিতর্ক কোরো না।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৪৬)

আল্লাহর প্রিয় বান্দারা অনর্থক বিতর্ক এড়িয়ে চলে : আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের একটি উত্কৃষ্ট চরিত্র হলো-তারা জাহেল ও মূর্খ লোকদের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়ে না। তারা এড়িয়ে চলার পদ্ধতি অবলম্বন করে এবং ফালতু বিতণ্ডা বর্জন করে। তারা কোনো অজ্ঞ শত্রুর কাছ থেকে নিজেদের সম্পর্কে অর্থহীন ও বাজে কথাবার্তা শুনলে তার জবাব দেওয়ার পরিবর্তে একথা বলে দেয়, আমার সালাম গ্রহণ করো। আমি অজ্ঞদের সঙ্গে বিতণ্ডায় জড়াতে চাই না। আল্লাহ বলেন, ‘আর তারা যখন অসার বাক্য শোনে তখন তা উপেক্ষা করে চলে এবং বলে, আমাদের আমল আমাদের জন্য এবং তোমাদের আমল তোমাদের জন্য; তোমাদের প্রতি সালাম। আমরা অজ্ঞদের সঙ্গে জড়াতে চাই না।’ (সুরা : কাসাস, আয়াত : ৫৫)

আল্লাহ আরো বলেন, “তারাই পরম দয়াময়ের বান্দা, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং তাদের যখন অজ্ঞ ব্যক্তিরা সম্বোধন করে, তখন তারা বলে, ‘সালাম’।” (সুরা : ফুরকান, আয়াত : ৬৩)

এখানে ‘সালাম’ বলার অর্থ মুখ ফিরিয়ে নেওয়া ও তর্কবিতর্ক ছেড়ে দেওয়া।

পরিশেষে বলা যায়, ইসলাম অনর্থক ও অসার তর্কবিতর্ককে স্পষ্টভাবে নিন্দা করেছে এবং এটিকে আল্লাহর অপছন্দনীয় কাজ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) অহেতুক ঝগড়া পরিহারকারী ব্যক্তির জন্য জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন, যা এই আচরণের গুরুত্ব ও মর্যাদা নির্দেশ করে। তবে প্রয়োজনের ক্ষেত্রে ইসলাম সদ্ভাবে, প্রজ্ঞা ও শালীনতার সঙ্গে যুক্তিভিত্তিক আলোচনা করার অনুমতি দিয়েছে। আল্লাহর প্রিয় বান্দারা কখনো মূর্খতা ও হট্টগোলের জবাবে তর্কে জড়ায় না, বরং তারা ধৈর্য, নম্রতা ও আত্মমর্যাদার পরিচয় দেয়। অতএব, ব্যক্তি ও সমাজের শান্তি, ঐক্য এবং নৈতিক উৎকর্ষ বজায় রাখতে অযথা তর্ক বর্জন করে হিকমতপূর্ণ সংলাপ ও সহনশীলতার পথ অবলম্বন করতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক, আরবি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

Manual8 Ad Code

বিডি প্রতিদিন

Latif Travels
Metropolitan University

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন

📞 মোবাইল: +8801712540420

✉️ ইমেইল: pavel.syl@gmail.com