প্রাধান্য জানমালের নিরাপত্তা সুশাসন ও দুর্নীতি রোধ
আজ বিএনপির ইশতেহার
শফিউল আলম দোলন
সব শ্রেণিপেশার মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সুশাসন প্রতিষ্ঠাসহ যেকোনো মূল্যে দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরার বিষয়গুলোকে অধিকতর প্রাধান্য দিয়ে রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতে ৩১ দফা কর্মসূচির সমন্বয়ে ২৭ দফা নির্বাচনি ইশতেহার তৈরি করেছে বিএনপি। আজ (শুক্রবার) বিকাল ৩টায় রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে এ নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করবেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে তৈরি করা বিএনপির এ ইশতেহারে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, পরিবেশ এবং খতিব-ইমাম-মুয়াজ্জিনদের মাসিক সম্মানিসহ জনমুখী ইস্যুকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। “করবো কাজ- গড়বো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ” তারেক রহমানের এ স্লোগানকে নির্বাচনি ইশতেহারে সংযুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতে বিএনপির চেয়ারম্যানের বক্তব্যও ইশতেহারে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। নারী এবং তারুণ্যের আকাঙ্ক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে এবং জুলাই জাতীয় সনদের সমন্বয়ে ইশতেহারের বিষয়বস্তু চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
ইশতেহারে বিএনপি ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, মানবাধিকার সুরক্ষা, বাক-স্বাধীনতা, স্বচ্ছ প্রশাসন ও জাতীয় অর্থনীতি পুনরুদ্ধার অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এ ছাড়া জুলাই সনদের আলোকে মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে পূর্ণ স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা দেওয়ার কর্মপরিকল্পনা থাকবে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন বলেন, বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে তাদের আকাঙ্ক্ষার আলোকে এবং আমাদের ৩১ দফা ও ২৭ দফার আলোকেই এবারের ইশতেহার তৈরি করা হয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, ফ্যামিলি কার্ড, পরিবেশ এগুলো মূল প্রাধান্য পাচ্ছে। এর বাইরে সুশাসন, রাষ্ট্রকাঠামো, জবাবদিহিতাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, শাসনব্যবস্থা পুনর্গঠন, মানবাধিকার রক্ষা, প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ এবং দুর্নীতিবিরোধী কাঠামো শক্তিশালীকরণ ইশতেহারের মূল বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান ও স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান এ প্রসঙ্গে বলেন, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি যে নির্বাচনি ইশতেহার পেশ করতে যাচ্ছে, এতে শ্রমিকরা যা চেয়েছে তার চেয়েও বেশি বিএনপি বলবে। সবাই শুধু দ্রব্যমূল্যের কথা বলছে। কিন্তু তাদের যাতায়াত ভাড়া এবং চিকিৎসাসহ বিভিন্ন কারণে অতিরিক্ত খরচ হয়। তাই জীবনযাত্রার ব্যয়ের যে বৃদ্ধি তার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হতে হবে আমাদের মজুরি। ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে ইশতেহারে উল্লেখ থাকবে, প্রতি মাসে ২০০০-২৫০০ টাকার আর্থিক সহায়তা অথবা খাদ্য সুবিধা চাল, ডাল, তেল, লবণসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য দেওয়া হবে। কৃষকের জন্য নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য কৃষক কার্ড নিয়ে বলা হয় ন্যায্যমূল্যে সার, বীজ, কীটনাশক, সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা, স্বল্পমূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি সুবিধা, স্বল্পব্যয়ে সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, কৃষিবিমা সুবিধা, ন্যায্যমূল্যে কৃষিপণ্য বিক্রয়ের সুবিধা, কৃষিবিষয়ক প্রশিক্ষণ, মোবাইলে আবহাওয়া ও বাজার তথ্য, মোবাইলে ফসলের চিকিৎসা সুবিধা, মৎস্য চাষি ও প্রাণিসম্পদ খামারিরাও কৃষক কার্ডের সুবিধা পাবেন। সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ গঠনে বিএনপির পরিকল্পনায় বলা হয়েছে দেশের প্রতিটি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রকে জবাবদিহিতার আওতায় এনে দুর্নীতি প্রতিরোধ করা হবে, দেশজুড়ে সব নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নতুন করে প্রায় ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, যার ৮০ ভাগ হবেন নারী, পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি মহানগর ও জেলা শহরে বসবাসকারী সব নাগরিকের জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে।
আনন্দময় শিক্ষা, দক্ষ জনশক্তি ও আধুনিক বাংলাদেশ গঠনের বিষয়ে উল্লেখ থাকবে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আধুনিক ও সময়োপযোগী প্রশিক্ষণ, দক্ষতা অর্জনসহ সার্বিক সুযোগসুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ট্যাবলেট কম্পিউটার প্রদান করা হবে, শিক্ষামূলক ছবি, ভিডিও, ডকুমেন্টারি ও অনলাইন কনটেন্টের মাধ্যমে কারিকুলাম ও নৈতিক শিক্ষার জন্য প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হবে, ক্লাস সিক্স থেকে টিমওয়ার্ক, পার্সোনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট, পারিবারিক, সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষাকে আনন্দময় করে তোলা হবে, দেশবিদেশে কর্মসংস্থান ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরিতে বাংলা-ইংরেজির পাশাপাশি আরবি, জাপানিজ, কোরিয়ান, ইতালিয়ান, ম্যান্ডারিন ইত্যাদি তৃতীয় ভাষা শিক্ষা মাধ্যমিক পর্যায় থেকে চালু করা হবে, আত্মকর্মসংস্থান ও বহির্বিশ্বে চাকরির সুযোগ তৈরিতে শিক্ষার্থীদের দক্ষ এবং যোগ্য করে গড়ে তুলতে মাধ্যমিক পর্যায়ে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হবে, মননশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষার্থীদের ফুটবল, ক্রিকেট, সাঁতার খেলা এবং সংগীত, নৃত্য, নাটক ইত্যাদি সাংস্কৃতিকবিষয় পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা হবে। আরও থাকছে সারা দেশে অন্তত ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও নদী খনন-পুনঃখনন করে পানিপ্রবাহ নিশ্চিতকরণ করার কথা, তিস্তা ব্যারাজ উন্নয়ন ও পদ্মা ব্যারাজের মতো প্রকল্প গ্রহণ করা, ২৫ কোটি গাছ পাঁচ বছরে রোপণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করা এবং সারা দেশে পর্যায়ক্রমে সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা।
খতিব, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সামাজিক মর্যাদা ও জীবনমান উন্নয়ন নিয়ে বলা হয়েছে খতিব, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের মাসিক সম্মানি প্রদান করা হবে, ধর্মীয় উৎসবে বিশেষ ভাতা দেওয়া হবে, দক্ষতা-উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে, অন্য ধর্মের (হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও অন্য) উপাসনালয়ের প্রধানদের মাসিক সম্মানি ও উৎসব ভাতা প্রদান করা হবে।
গতকাল রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আজ বিকাল ৩টায় দলের নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করা হবে বলে জানান। তিনি আরও জানান, ৮ ফেব্রুয়ারি রবিবার বেলা ২টায় বিএনপির সর্বশেষ নির্বাচনি জনসভা অনুষ্ঠিত হবে রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে। প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখবেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শেষ নির্বাচনি জনসভা সফল করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। ঢাকা এবং আশপাশের প্রার্থীরা এ জনসভায় উপস্থিত থাকবেন। শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের আশা প্রকাশ করে রিজভী বলেন, ভোটাররা নির্ভয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন, সেটিই প্রত্যাশা। বিএনপি অতীতে সবসময় জনমানুষের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করেছে।
বিডি প্রতিদিন