ফাইল ছবি
মা দ ক সকল পা পে র উৎস
শায়খ আহমাদুল্লাহ
মাদক এক ভয়াবহ ব্যাধি, যা পুরো সমাজকে ধ্বংসের অতলে ঠেলে দেয়। আমাদের সমাজে এই ব্যাধি এখন বিষবাষ্পের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। তরুণ-যুবকদের পাশাপাশি অনেক শিশু-কিশোরও এখন মাদকাসক্ত। ইসলামে মাদক কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ মাদককে শয়তানের কাজ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ, নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্যনির্ধারক তিরসমূহ অপবিত্র ও শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা এগুলো পরিহার করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো’ (সুরা মায়িদা-৯০)।
মাদক বলতে শুধু নির্দিষ্ট কোনো পানীয় নয়; বরং সব ধরনের নেশাজাতীয় দ্রব্যই ইসলামে নিষিদ্ধ। ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক নেশাজাতীয় দ্রব্যই মদ, আর প্রত্যেক নেশাজাতীয় দ্রব্যই হারাম’ (মুসলিম-২০০৩)।
আধুনিক যুগে মাদকের ধরন ও নাম বদলে গেছে। ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইনসহ বিভিন্ন ধরন ও বিভিন্ন নামে মাদকদ্রব্য বেরিয়েছে। নাম ও ধরন যা-ই হোক, কোনো দ্রব্য নেশা ও মস্তিষ্ক বিকৃতি করলে তা ইসলামের নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত।
সমাজে অশ্লীলতা, বেলেল্লাপনা এবং যত ধরনের অপরাধ আছে, এর পেছনে মাদকের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। এ কারণে মাদককে সব পাপের উৎস বা পাপের চাবিকাঠি বলা হয়। এ প্রসঙ্গে সাহাবি উসমান (রা.)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য আমরা স্মরণ করতে পারি। তিনি বলেছিলেন, তোমরা মাদক পরিহার করো, কারণ এটি সব অপকর্মের মূল।’ এরপর তিনি অতীতের এক ইবাদতগুজার ব্যক্তির ঘটনা বর্ণনা করেন, যাকে এক নারী তিনটি পাপের যেকোনো একটি বেছে নেওয়ার জন্য বাধ্য করেছিল-হয় ব্যভিচার করতে হবে, নয়তো একটি নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা করতে হবে, অথবা এক পেয়ালা মদ পান করতে হবে। লোকটি ভাবল, মদ্যপানই এদের মধ্যে তুলনামূলক কম ক্ষতিকর। কিন্তু সে যখন মদ পান করে মাতাল হয়ে পড়ল, তখন সে ব্যভিচারেও লিপ্ত হলো এবং নিজের অপরাধের সাক্ষ্য মুছে ফেলতে সেই শিশুটিকেও নির্মমভাবে হত্যা করল। ঘটনাটি বর্ণনা করে উসমান (রা.) মদ থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেন। এরপর তিনি শপথ করে বলেন, মদ ও ইমান কখনো সহাবস্থান করে না। এর একটি অন্যটিকে বের করে দেয় (সুনানে নাসায়ি-৫৬৬৬)।
এই হাদিসের বাস্তব প্রতিফলন আজ আমরা আমাদের সমাজে প্রতিনিয়ত দেখতে পাই। মাদকাসক্ত নেশায় বুঁদ হয়ে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে জড়িয়ে পড়ছে অনৈতিক সম্পর্ক ও অশ্লীলতায়, কেউ ঘটাচ্ছে চুরি, ছিনতাই ও হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধ। মাদকের অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে অনেকে বিসর্জন দিচ্ছে নিজের বিবেক, নৈতিকতা ও পারিবারিক দায়িত্ববোধ। এভাবে মাদক একদিকে যেমন দেশের শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে, অন্যদিকে দুর্বল করে দিচ্ছে সমাজের নৈতিক ভিত্তি। শুধু তা-ই নয়, ইমান-আমলকেও নষ্ট করে দেয় মাদক। প্রিয়নবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মদপান করে এবং মাতাল হয়, চল্লিশ দিন পর্যন্ত তার নামাজ কবুল হয় না। সে মারা গেলে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আর যদি সে তওবা করে তবে আল্লাহ তার তওবা কবুল করবেন। সে পুনরায় মদ্যপানে লিপ্ত হলে কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে ‘রাদগাতুল খাবাল’ নামক বীভৎস পানীয় পান করাবেন। সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসুল! ‘রাদগাতুল খাবাল’ কী? তিনি বললেন, জাহান্নামিদের দেহ থেকে নির্গত পুঁজ ও রক্ত’ (ইবনে মাজাহ-৩৩৭৭)।
মাদকাসক্তির পেছনে নানা কারণ কাজ করে। অসৎ সঙ্গ, কৌতূহল, হতাশা, পারিবারিক অশান্তি, মানসিক চাপ এবং মাদক সম্পর্কে অসচেতনতা মানুষকে এ পথে নিয়ে যেতে পারে। কেউ বন্ধুমহলের প্রভাবে প্রথমবার মাদক গ্রহণ করে, পরে ধীরে ধীরে আসক্ত হয়ে পড়ে। আবার কেউ জীবনের সমস্যা ও হতাশা থেকে সাময়িক মুক্তি পাওয়ার আশায় মাদকের আশ্রয় নেয়। কিন্তু মাদক কোনো সমস্যার সমাধান নয়, এটি বরং নতুন সমস্যা সৃষ্টি করে এবং বিদ্যমান সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে। তাই মাদক থেকে দূরে থাকতে হলে এর কারণগুলো চিহ্নিত করা এবং সেগুলোর কার্যকর সমাধানে উদ্যোগী হওয়া প্রয়োজন। মদিনার সমাজে যখন মদের নিষেধাজ্ঞা এসেছিল, তখন সাহাবায়ে কেরাম কোনো দ্বিধা করেননি। ঘরের সব মদের পাত্র ভেঙে তাঁরা মদিনার অলিগলিতে তা বইয়ে দিয়েছিলেন। মাদক নামের এই সামাজিক মারণব্যাধি থেকে বাঁচতে আজ আমাদেরও সেই ঐতিহাসিক দৃঢ়তার প্রয়োজন। কেবল আইন প্রয়োগ করে বা শাস্তি দিয়ে এ ব্যাধি নির্মূল সম্ভব নয়; প্রয়োজন পারিবারিক সতর্কতা, সন্তানদের প্রতি পিতা-মাতার নজরদারি এবং আত্মিক পরিশুদ্ধি। মহান আল্লাহ তৌফিক দান করুন।
জুমার মিম্বর থেকে
♦ গ্রন্থনা : নুরুল ইসলাম তানঈম
বিডি প্রতিদিন