• সিলেট, দুপুর ২:৫০, ১১ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

স্মৃতিময় একাত্তর : অগ্নিঝরা মার্চ

admin
প্রকাশিত মার্চ ১, ২০২৬
স্মৃতিময় একাত্তর : অগ্নিঝরা মার্চ

Manual5 Ad Code

 

স্মৃতিময় একাত্তর : অগ্নিঝরা মার্চ

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

 

একাত্তরের মার্চের দিনগুলোর কথা বারবার স্মৃতিতে আসে এবং আসবেই। কারণ তা ছিল কঠিন দুঃসময়। আমরা প্রত্যেকেই ভীষণ বিপদে ছিলাম। প্রতিটি দিন, প্রতিটি রাত, এমনকি মুহূর্তও ছিল মহা আতঙ্কের।

Manual8 Ad Code

মুখ্যত ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়েই ভাবতাম। বড়জোর আপনজনদের বিষয়ে। এর মধ্যেও আমরা ব্যস্ত ছিলাম। খবরের আদান-প্রদান করি, কোথায় কী ঘটছে জানতে চাই, রেডিও শুনি, মুক্তিযোদ্ধাদের কিভাবে সাহায্য করা যায়, তা নিয়ে চিন্তা করি।

আর যাঁরা যুদ্ধে ছিলেন, তাঁদের তো মরণপণ অবস্থা। আমাদের সবার জন্য কাজ ছিল। বিপদ আমাদের তাড়া করছিল, কিন্তু স্বপ্নও ছিল। সামনে একটি স্বপ্ন ছিল।

সমষ্টিগত এবং মস্ত বড় স্বপ্ন। আমরা আশা করতাম, হানাদারদের তাড়িয়ে দেব, আমরা মুক্ত হব, আর সেই লক্ষ্যে আমরা কাজও করতাম। যে যেভাবে পারি কাজ করতে চাইতাম।
ওই যে চিন্তা-ভাবনা করা, স্বপ্ন দেখা, দুঃস্বপ্নে শিউরে ওঠা—এসব এখনো চলছে। কিন্তু সমষ্টিগত স্বপ্নটি এখন আর যেন নেই।

সবার মুক্তির কথা এখন আর ভাবা হয় না। ব্যস্ত সবাই নিজেরটি নিয়ে। আমার কী হলো, আমি কী পেলাম—হিসাব এখন সেটিরই। একাত্তরেও নিজের কথা কেউ ভাবত না, তা তো নয়। অবশ্যই ভাবত, কিন্তু সেই দুঃস্বপ্নের কালে এটি জানা ছিল আমাদের, আমাদের ব্যক্তিগত মুক্তি সবার মুক্তির সঙ্গে যুক্ত। দেশকে যদি হানাদারমুক্ত না করা যায়, তাহলে ব্যক্তিগতভাবে আমরা কেউই বাঁচব না। তাই বাঁচার লড়াইটি সর্বজনীন লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সবাই যে এক জায়গায় ছিলাম, তা তো নয়। দেশের ভেতরে ছিলাম। ছিলাম আমরা দেশের বাইরে। কিন্তু যেখানেই থাকি, চিন্তা ছিল ওই একটিই। কবে মুক্ত হবে এবং কিভাবে তাড়ানো যাবে হানাদার পাকিস্তানি নরঘাতকদের।

তারপর কী ঘটল? বিজয়ের পর আমাদের অভিজ্ঞতাটি কী? তা একেবারেই ভিন্ন রকমের। দেখা গেল, আমরা আলাদা হয়ে গেছি। আমাদের স্বপ্নগুলো ব্যক্তিগত হয়ে গেছে। আমাদের হাতে সময় নেই সমষ্টিগত স্বার্থ নিয়ে চিন্তা করার। অথচ সমষ্টিগত কাজ কত পড়ে রয়েছে! আমাদের দরকার দারিদ্র্য দূর করা। চাই শিল্পে বিনিয়োগ। প্রয়োজন কিঞ্চিৎ মনোযোগী হওয়া। শিক্ষায় এগিয়ে যাওয়া। এগুলো সবাই মিলে করার কাজ। কারো একার পক্ষে এসব করা সম্ভব নয়, কিন্তু সবাই যে মিলিতভাবে এসব কাজ করব, তা তো হচ্ছে না। যা করার, ব্যক্তিগত পর্যায়ে করছি।

সবাই মিলে করব এমনটা কেন হচ্ছে না, তা ভেবে দেখার মতো। ভাবতে গেলে মনে হয় কূল-কিনারা নেই। আমরা দোষ দিই রাজনৈতিক নেতৃত্বের। কিন্তু দেশটি যে স্বাধীন হয়েছে, তা তো রাজনৈতিক নেতৃত্বের কারণেই। মুক্তির যে আন্দোলন, তাকে তারাই গড়ে তুলেছে। স্বাধীনতার জন্য আন্দোলনের কৃতিত্ব দাবি করতে পারেন—যা করার রাজনীতির লোকজনই করেছেন। তবে তাঁরা যে আমাদের অনেক দূর নিয়ে যাবেন, তা করতে পারেননি। একটি সীমা পর্যন্ত এগিয়েছেন, তারপর তাঁদের যাত্রা শেষ।

হ্যাঁ, রাষ্ট্র বদল হয়েছে। ব্রিটিশ আমলে যে রাষ্ট্রের অধীনে আমরা বসবাস করতাম, তা ছিল অনেক বড়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করে রাষ্ট্রের আয়তন আমরা ছোট করলাম। বাংলাদেশ একসময়ের তুলনায় আরো ক্ষুদ্রাকার একটি রাষ্ট্র বটে। এই রাষ্ট্র নতুন, কিন্তু কতটা নতুন? বড় সমস্যাটি ওখানেই। আমরা নতুন রাষ্ট্র পেয়েছি। ব্রিটিশ ও পাঞ্জাবিদের শাসনাধীন যে রাষ্ট্র ছিল, সেই রাষ্ট্রের কাঠামো এবং চরিত্র যেমন ছিল আমলাতান্ত্রিক, স্বাধীন বাংলাদেশও সেই রকমেরই আমলাতান্ত্রিক রয়ে গেছে। বদলায়নি। সেই একই আইন-আদালত, নিয়ম-কানুন, প্রশাসন, বিভিন্ন রকমের বাহিনী এখনো রয়ে গেছে।

Manual8 Ad Code

আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ক্ষমতা থাকে সরকারি আমলাদের হাতে। পরাধীন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ আমলারাই ছিলেন সর্বেসর্বা। পাকিস্তান আমলেও আমলারাই রাষ্ট্র শাসন করেছেন এবং তাঁদের সামরিক আমলারাই পূর্ববঙ্গে গণহত্যা ঘটিয়েছেন। বাংলাদেশেও আমরা বারবার সামরিক শাসন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, জরুরি অবস্থা, অন্তর্বর্তী সরকার ইত্যাদি পেয়েছি। রাজনৈতিক নেতারা যখন দেশ শাসন করেছেন বলে মনে হয়েছে, তখনো ক্ষমতার চাবিকাঠি আমলাদের হাতেই ছিল।

অসাংবিধানিক সরকার কখনোই গণতান্ত্রিক হতে পারে না, হয় না, হওয়ার উপায় নেই। গণতন্ত্রের জন্য চাই জবাবদিহি। আমলাতন্ত্রের জন্য কোনো জবাবদিহির বালাই থাকে না। গণতন্ত্রে ক্ষমতা ছড়িয়ে থাকে সর্বত্র। আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার সব ক্ষমতা চলে যায় কেন্দ্রে। গণতন্ত্রে জনপ্রতিনিধিদের শাসন থাকে, আমলাতন্ত্রে শাসন করেন কিছু উড়ে এসে জুড়ে বসারা। তাঁরা দেশের স্বার্থের কথা ভাবেন না, ভাবেন নিজেদের স্বার্থের কথা।

Manual7 Ad Code

রাজনৈতিক নেতাদের ব্যর্থতা এখানে। তাঁরা পুরনো আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রটি ভেঙে সেখানে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। তাঁরা রাষ্ট্র শাসনের ক্ষমতা পেয়েছেন এবং তাতেই সন্তুষ্ট থেকেছেন। তাঁরা ভেবেছেন একসূত্র হতে পেরেছেন। জনগণের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যে রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, পরে মালিকানা যে জনগণের হবে, এ কাজে বিন্দুমাত্র উৎসাহ নেই তাঁদের, এখনো তো নেই-ই। তাঁরা লুণ্ঠন করতে চান এবং লুণ্ঠনকারীদের মধ্যে যে ধরনের সংঘর্ষ বাধে, তা-ই আমরা তাঁদের মধ্যে ঘটছে দেখতে পাই।

আদর্শের কথা বলছিলাম। ওই আদর্শের একটি নাম আছে। বিশ্বজুড়ে যার পরিচিতি হলো পুঁজিবাদ। পুঁজিবাদ উৎপাদন করে থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে যে পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, তা উৎপাদনে যতটা আগ্রহী, তার চেয়ে বেশি আগ্রহী লুণ্ঠনে। অন্যদিকে পুঁজিবাদের যেসব দোষ, তা সবই আমাদের প্রতিনিয়ত সহ্য করতে হচ্ছে। যেমন—ব্যক্তিগত স্বার্থ দেখা এবং ভোগবিলাসে মত্ত হওয়া। একাত্তরে এটি ছিল না। একাত্তরে সবার স্বার্থ এক হয়ে গিয়েছিল এবং ভোগবিলাসের কোনো প্রশ্নই ওঠেনি। মানুষের চিন্তা ছিল কিভাবে দেশকে মুক্ত করা যায় তা নিয়ে, উৎসাহ ছিল আত্মত্যাগে। আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলি। সেই চেতনাটি হচ্ছে গণতান্ত্রিক, যার মূলকথাটি হচ্ছে মানুষে-মানুষে অধিকার ও সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠা করা। একাত্তরের যুদ্ধক্ষেত্রে ওই সাম্যটি গড়ে উঠেছিল। যুদ্ধক্ষেত্রটি তো কোনো একটি জায়গায় সীমাবদ্ধ ছিল না, তা বিস্তৃত ছিল দেশব্যাপী। দেশব্যাপী কেন বলছি, লড়াইটি তো বিদেশেও চলেছে, যাতে জড়িত ছিলেন প্রবাসীরাও।

পুঁজিবাদী আদর্শ ফিরে এসেছে। ওই আদর্শেই ব্রিটিশের রাষ্ট্র পরিচালিত হয়েছে। পাকিস্তানিরাও ওই আদর্শেই দীক্ষিত ছিল। এখনকার শাসনকর্তারাও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পুঁজিবাদী আদর্শের আশ্রয়েই রয়েছেন। ফলে রাষ্ট্রের আদর্শ তো বটেই, সমাজের আদর্শও সেই আগের মতোই রয়ে গেছে, বদলায়নি।

আমাদের জন্য প্রথম যা দরকার, তা হলো কাজ। মানুষ কাজ চায়। কাজ বাড়াতে হলে বিনিয়োগ চাই। বিনিয়োগের জন্য পুঁজি দরকার। এদিকে আমলাতান্ত্রিক এই রাষ্ট্র যে বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি করবে, তা-ও করছে না। কেননা তারা ঘুষ, দুর্নীতি বোঝে, কর্মসৃষ্টি বোঝে না।

আরেকটি মারাত্মক ঘটনা ঘটেছে। তা হলো বৈষম্য বৃদ্ধি। ধনীকে সে আরো ধনী করে, গরিবকে করে আরো গরিব। বাংলাদেশের গত ৫৪ বছরের ইতিহাস সর্বাধিক বৈষম্য বৃদ্ধির ইতিহাস। একাত্তরের চেতনা যে ঐক্য গড়ে তুলেছিল, বৈষম্য বৃদ্ধি তাকে পদে পদে দলিত-মথিত করেছে।

একাত্তরের গৌরব ছিল দেশপ্রেম। সেই দেশপ্রেম এখন আর দেখা যাচ্ছে না। কারণ পুঁজিবাদী আদর্শের অপ্রতিহত দৌরাত্ম্য। প্রত্যেকেই যদি কেবল নিজের কথাই ভাবেন, তাহলে দেশের কথা ভাববেন কে? কিন্তু ভাবতে তো হবে! দেশ না থাকলে তো আমরা নেই। কেবল যে পরিচয় বিলীন হয়ে যাবে তা নয়, দাঁড়ানোর জায়গাটিও থাকবে না। আমরা শেওলার মতো ভাসতে থাকব।

ভাবলেই চলবে না, কাজও চাই। সবচেয়ে বড় কাজটি হচ্ছে রাষ্ট্র ও সমাজকে গণতান্ত্রিক করা। কারা করবেন চিন্তা-ভাবনা এবং যোগ দেবেন এ কাজে? দেবেন তাঁরাই, যাঁরা দেশপ্রেমিক ও গণতান্ত্রিক। তাঁদের সংখ্যা কম নয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাটি তো এক দিনে গড়ে ওঠেনি, তা আছে এবং থাকবেও।

নইলে বিপদ বাড়বে, এখন যেমন বাড়ছে, বেড়েই চলেছে। বিদ্যমান এই ব্যবস্থার পরিবর্তনের ওপরই আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। অনেক কাজই জরুরি। তবে সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে দেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গণতান্ত্রিক করা, তা ভুললে চলবে না।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

Manual5 Ad Code

বিডি প্রতিদিন

Latif Travels
Metropolitan University

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন

📞 মোবাইল: +8801712540420

✉️ ইমেইল: pavel.syl@gmail.com