মৌলভীবাজারে ঈদের ছুটিতে পর্যটনস্পটে ভিড়, অর্ধ শতকোটি টাকার ব্যবসার সম্ভাবনা
অনলাইন ডেস্ক
ঈদের ছুটিতে মৌলভীবাজার জেলায় পর্যটকদের উপচেপড়া ভিড় আর প্রতিদিনও বাড়তে শুরু করেছে পর্যটকের উপস্থিতি।
রবিবার (২২ মার্চ) ঈদের দ্বিতীয় দিন সকাল থেকেই পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে প্রতিটি স্পটে।
এর আগে ঈদের দিন বিকাল থেকে মৌলভীবাজার জেলায় দর্শনার্থীদের একই অবস্থা ছিল। এতে লাউয়াছড়া সড়ক ও বধ্যভূমি এলাকার সড়কে তৈরি হয় তীব্র যানজট। দর্শনার্থীরা পড়েন ভোগান্তিতে। এমন দৃশ্য দেখা যায় শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভানুগাছ সড়কের বধ্যভূমি, বিটিআরআই চা বাগান ও লাউয়াছড়া সড়ক এলাকায়।
পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, রমজানের একমাসের আগে থেকেই নিস্তব্ধ ছিল পর্যটন স্পট। তবে ঈদের ছুটি শুরু হতেই প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পেয়েছে জেলার পর্যটন স্পটগুলো। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য আর ঈদের আনন্দ দুই মিলিয়ে পর্যটকদের ভিড়ে মুখর এখন মৌলভীবাজার জেলা।
পর্যটন সংশ্লিষ্টরা জানান, এবার ঈদে লাখো পর্যটক মৌলভীবাজার ভ্রমণে আসতে পারেন এবং প্রায় অর্ধ শতকোটি টাকার ব্যবসার সম্ভাবনা রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, শ্রীমঙ্গল ভানুগাছ সড়কের ১০নং এলাকা থেকে বধ্যভূমি দিকে অল্প এগোলেই যানজট শুরু। দীর্ঘক্ষণ বসে থেকে অনেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহন থেকে নেমে যান। প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকা হেঁটে তাঁরা বিটিআরআই চা বাগান এলাকা ঘুরে দেখেন। আবার চা বোর্ডের নিয়ন্ত্রণধীন টি রিসোর্ট এর সামনে থেকে মানুষের ঢল থাকায় যানজটে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকতে হচ্ছে। ফলে সব ধরনের দর্শনার্থীরা পায়ে হেঁটে যেতে বাধ্য হচ্ছেন বিভিন্ন স্পটে।
স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে শ্রীমঙ্গল উদ্দেশে আসেন রফিকুল ইসলাম। পরিবার নিয়ে তিনি হেঁটে হেঁটে বধ্যভূমির দিকে যাচ্ছিলেন। বনবিভাগের অফিসের সামনে থেকে একটু এগোতেই দেখি প্রচুর যানজট। কিছুক্ষণ বসে থেকে তাই পরিবার নিয়ে হেঁটেই রওনা দিলাম বধ্যভূমি ও বিটিআরআই চা বাগানে।
এদিকে জেলার হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ ব্যবসায়ীরা জানান, ঈদকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে প্রায় পুল বুকিং থাকায় পর্যটকের উপস্থিতি লক্ষণীয়।
শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সভাপতি মো. সেলিম আহমেদ জানান, জেলার শতাধিক পর্যটন স্পটের মধ্যে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জই পর্যটকদের প্রথম পছন্দ। এ দুই উপজেলাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে দেড় শতাধিক রিসোর্ট, ইকো কটেজ ও হোটেল-মোটেল।
তিনি বলেন, ‘ঈদের লম্বা ছুটিতে শতভাগ বুকিং হয়েছে।’
ব্যবসায়ীরা জানান, রমজানের আগ থেকেই পর্যটক না থাকায় পরিবহন ও পর্যটন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যবসায় স্থবিরতা নেমে আসে। তবে ঈদের ছুটিকে সামনে রেখে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর আশায় প্রতিষ্ঠানগুলো সাজানো হয়।
অপরদিকে পর্যটকদের আকর্ষণ করতে প্রায় সব হোটেল-রিসোর্টে রাখা হয়েছে বিশেষ অফার ও সুযোগ-সুবিধা। একইসঙ্গে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ট্যুরিস্ট পুলিশ, থানা পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠে রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার রাধানগর এলাকায় অবস্থিত প্রায় অর্ধশত রিসোর্ট ও কটেজে ২২ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত প্রায় শতভাগ বুকিং সম্পন্ন হয়েছে। শহরের হোটেলগুলোতে পর্যটকের আগমনে সেগুলোও পূর্ণ হয়ে গেছে।
পর্যটন ব্যবসায়ীরা বলেছেন, শহরের কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটাতে পর্যটকরা শহরের বাইরের রিসোর্ট ও কটেজে বেশি আগ্রহী। এছাড়া এসব স্থানে কক্ষসংখ্যা কম থাকায় আগাম বুকিং দ্রুত পূর্ণ হয়ে যায়। সব মিলিয়ে অর্ধশতকোটি টাকার ব্যবসার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রকৃতিক সৌন্দর্য়ে ভরপুর জেলার শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ অঞ্চলকে ঘিরে রয়েছে বিস্তীর্ণ সবুজ চা-বাগান, বৈচিত্র্যময় বিভিন্ন নৃ-জাতীগোষ্ঠির সংস্কৃতি এবং মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। জেলার ৯৩টি চা-বাগানের সবুজের সমারোহ, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের জীববৈচিত্র্য, মাধবকুন্ড ও হামহাম জলপ্রপাত, মাধবপুর লেকসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ।
এ অঞ্চলের জনপ্রিয় পর্যটন স্পটগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ চা গবেষণা কেন্দ্র (বিটিআরআই), হাইল হাওর, বাইক্কা বিল, চা জাদুঘর, চা কন্যার ভাস্কর্য, সাত রঙের চা, বধ্যভূমি-৭১, বাংলদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন, রাবার বাগান, বন্যপ্রাণী সেবাকেন্দ্র, খাসিয়া পুঞ্জি, মনিপুরী সম্প্রদায়ের তাঁতশিল্প, গারোপল্লী, ভাড়াউড়া লেক, শংকর টিলা, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, ধলই চা বাগানে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধ, ক্যামেলিয়া লেক, হরিণছড়া গলফ মাঠসহ আরও অনেক স্থান।
পাঁচ তারকা হোটেল গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফের জেনারেল ম্যানেজার আরমান খান বলেন, ‘ঈদে বিদেশি পর্যটক তুলনামূলক কম এলেও দেশীয় পর্যটকের চাপ বেশি। এবারও আমাদের ৭/৮ দিনের জন্য বুকিং শত ভাগ হয়েছে।’
বালিশিরা রিসোর্টের পরিচালক রাসেল আহমেদ বলেন, পুল বুকিং সম্পন্ন হয়েছে। পর্যটক সমাগম আরও বেশি হবে।’
ট্যুরিস্ট পুলিশ শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ জোনের ওসি মো. কামরুল হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘ঈদে পর্যটকদের নিরাপত্তায় টহল জোরদার রয়েছে এবং সব সংস্থার সমন্বয়ে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।’
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ছুটিতে থাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত শ্রীমঙ্গল উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মুহিবুল্লাহ আকন বলেন, “পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়ে ইতিমধ্যে আমরা সকল হোটেল ও রিসোর্ট মালিকদের নির্দেশনা দিয়েছি। তাদেরকে বলেছি সকল আইনশৃঙ্খলা সংস্থার মোবাইল নং এবং ফায়ার সার্ভিসের নং সংগ্রহে রাখার জন্য। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে সাথে সাথে যেন তারা আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। তবে আশা করছি আমরা শান্তি শৃঙ্খলাভাবে ঈদ উৎসব উদযাপন করতে পারব।”