সীমান্তে বিজিবির সচেতনতা, মানবিক সহায়তার সমন্বিত প্রয়াস
জৈন্তাপুর প্রতিনিধি
সিলেটের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং সীমান্ত সুরক্ষায় জনসাধারণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
‘আলোর পথে’ শীর্ষক এই উদ্যোগের মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি, বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানবিক সহায়তা প্রদানে সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
রবিবার (২৬ এপ্রিল) জকিগঞ্জ ব্যাটালিয়ন (১৯ বিজিবি)-এর ব্যবস্থাপনায় জৈন্তাপুর উপজেলা অডিটোরিয়ামে জনসচেতনতামূলক সভা, ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পেইন এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে ১৯ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জুবায়ের আনোয়ার, পিএসসি’র সভাপতিত্বে এবং সহকারী পরিচালক হুমায়ন করিমের সঞ্চালনায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিলেট সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মোহাম্মদ সালাহ্উদ্দীন, পিএসসি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মোহাম্মদ সালাহ্উদ্দীন বলেন, সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু বিজিবির একার দায়িত্ব নয়; এতে স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, “সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী মানুষ যদি সচেতন হন, গুজবে কান না দেন এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বিজিবিকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেন, তাহলে চোরাচালান ও মাদক পাচার অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।”
তিনি আরও বলেন, ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা ও শিক্ষার অভাবের কারণে সীমান্ত এলাকার অনেক মানুষ উন্নয়নের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই সুযোগে অসাধু চক্র তাদের অবৈধ কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও কারিগরি শিক্ষার প্রসারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সভায় বক্তারা জানান, কিছু অসাধু চক্র সহজ আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে মাদক পাচার, পণ্য চোরাচালান ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে ফেলছে, যা ব্যক্তি, সমাজ ও দেশের অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তাই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং বৈধ আয়ের পথ তৈরি করাকে সময়ের দাবি হিসেবে তুলে ধরা হয়।
এ প্রেক্ষিতে স্থানীয়দের কৃষিকাজ, বাগান ও অন্যান্য উৎপাদনশীল কাজে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি “আলোর পথে” প্রকল্পের মাধ্যমে যুবকদের এলইডি বাল্ব তৈরির কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে জানানো হয়।
বক্তারা আরও বলেন, সীমান্তে চোরাচালান ও মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনায় বিজিবি সদস্যদের প্রতিকূল আবহাওয়া, দুর্গম এলাকা এবং সশস্ত্র চোরাকারবারীদের ঝুঁকির মুখে দায়িত্ব পালন করতে হয়। তবুও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তারা সর্বদা সতর্ক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন।
একই সঙ্গে অবৈধ বালু ও পাথর উত্তোলন বন্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা জানানো হয়, কারণ এটি পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করার পাশাপাশি সীমান্ত পিলারের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।
অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে দিনব্যাপী ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পেইনে কয়েকশ অসহায় মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রদান করা হয়। স্থানীয়দের মতে, এই উদ্যোগ সীমান্তবাসীর প্রতি বিজিবির মানবিক দায়িত্ববোধের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
এ সময় আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পদ্মাসন সিংহ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. রাসেলুর রহমান, সহকারী পুলিশ সুপার (কানাইঘাট সার্কেল) সালমান নূর আলম, জৈন্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা, জৈন্তাপুর মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান মোল্লা, সীমান্ত ব্যাংক সিলেট শাখার ব্যবস্থাপক তারেক মাহমুদ, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হুমায়ুন দিলদার এবং নিজপাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইন্তাজ আলীসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও গণমাধ্যমকর্মীরা।
পরে অতিথিরা ১৯ বিজিবির উদ্যোগে পরিচালিত এলইডি বাল্ব তৈরির প্রশিক্ষণ কর্মশালা এবং বিনামূল্যে মেডিক্যাল সেবাকেন্দ্রের কার্যক্রম পরিদর্শন করেন।
বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, “আলোর পথে” উদ্যোগের মাধ্যমে সীমান্ত এলাকার মানুষ সচেতন হয়ে বৈধ পথে আয়মুখী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হলে এই অঞ্চল এক সময় নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ এলাকায় পরিণত হবে।