তোমাকে ভালোবাসি ইয়া হোসাইন
আবু তালহা তারীফ
ইমাম হোসাইন প্রিয় নবী (সা.)-এর কলিজার টুকরা। নবী পরিবারের সদস্য। খাতুনে জান্নাত ও শেরে খোদা হজরত আলীর আদরের পুত্র। জান্নাতে যুবকদের সর্দার। পাকপাঞ্জাতন। উম্মতি মুহাম্মদিদের আদর্শ। তাঁকে ভালোবাসে হৃদয় দিয়ে নবীপ্রেমিকরা। কেননা তিনিই আহলে বাইত। পবিত্র কোরআনে উল্লেখ রয়েছে, ‘বলুন, আমি আমার রিসালাতের দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে তোমাদের কাছে কিছুই চাই না, কেবল আমার আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা ব্যতীত।’ সুরা শুরা, আয়াত নং ২৩।
ইমাম হোসাইন কারবালার ময়দানে রক্তমাখা কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘ও নানা তুমি কোথায়? আজ চলে আস নানা। তোমার নিষ্ঠুর উম্মতরা আমার নির্মম পরিণতি করেছে। ও নানা, আমি পিপাসিত। তোমার উম্মতরা আমায় পানি দেয়নি।’ তখন তোমার পিপাসার্থ কণ্ঠের মায়াবী ডাকে কারবালার ময়দানে উপস্থিত হয়েছিলেন প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)। এ ব্যাপারে হজরত সালমা (রা.) বলেন, ‘আমি একবার উম্মে সালমা (রা.)-এর কাছে গেলাম। আমি দেখলাম, তিনি অঝোরে কাঁদছেন। জিজ্ঞেস করলাম, হে আম্মাজান! আপনি কাঁদছেন কেন?’ উত্তরে তিনি বললেন, ‘কিছুক্ষণ আগে আমি রসুল (সা.)-কে স্বপ্নে দেখলাম। হুজুরের মাথায় ও দাড়ি মোবারক ধুলোমলিন দেখে জিজ্ঞেস করলাম, হে নবী! আপনার কী হয়েছে? সারা দেহে এমন মাটি লেগে আছে কেন?’ জবাবে নবীজি (সা.) বললেন, ‘উম্মে সালমা! তুমি তো জানো না, এই মাত্র কারবালার ময়দানে আমার নাতি হোসাইনকে শহীদ করা হয়েছে। আমি সেখান থেকেই এসেছি।’ (তিরমিজি শরিফ)
১০ মহররম সূর্য কারবালার ময়দানে রক্তের উত্তাপ দিচ্ছে। চারদিকে রক্তের বন্যা। লাশের মিছিল। হঠাৎ আক্রমণ শুরু হলো ইমাম হোসাইনের ওপর। ইমাম হোসাইন সত্যের পক্ষে ইয়াজিদ বাহিনীর বিরুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে শত্রুদের ওপর অপূর্ব বীরত্ব ও আক্রমণ চালালে একপর্যায়ে ক্ষতবিক্ষত হয় তাঁর পবিত্র শরীর মোবারক। যে শরীরে রসুল (সা.) চুমু দিয়েছিলেন সেই পবিত্র শরীর মোবারক থেকে রক্ত ঝরছে। রক্তে লাল কারবালা ময়দান। তির, বর্শা, তরবারির আঘাত বইছে তোমার পবিত্র শরীর মোবারকে। তাঁর পবিত্র চেহারা মোবারকে রক্তের জমাট। দাড়ি ভিজে গেল রক্তে। শরীর থেকে ঝরেছিল রক্তের ঝরনা। খাতুনে জান্নাতনুমাইয়ের এক পুত্র তাঁকে লক্ষ্য করে তির নিক্ষেপ করলে কণ্ঠনালীতে বিদ্ধ হয় সেই তির। আহ সেদিন কী করুণ পরিস্থিতি ছিল। প্রভুর পায়ে সিজদারত অবস্থায় তিরবিদ্ধ করা হয়। সেদিন ইমাম হোসাইন কেঁদেছিলেন, তাঁর কান্নার আওয়াজে আরশ কম্পিত হলেও কম্পিত হয়নি ইয়াজিদ বাহিনীদের পাষাণ হৃদয়। অবশেষে সানানা ইবনে আনাস নাখাঈ তার নিষ্ঠুরতার সঙ্গে একটি বর্শা নিক্ষেপে তোমার পেট ভেদ করে চলে যায়। কারবালার জমিনে লুটিয়ে যান বীর হোসাইন। ইয়াজিদ বাহিনী তাঁর পবিত্র দেহ মোবারক থেকে মস্তক বিচ্ছিন্ন করে দেহকে দলিতমথিত করে। হোসাইনের প্রতি নির্মমতায় সেদিন পৃথিবী কেঁদেছিল। সূর্য আপনপানে চেয়ে দেখছে মুনাফিক মুসলিমদের নিষ্ঠুরতা। কারবালা এত রক্ত গ্রহণ করতে পারেনি। জয়নব বলেছিলেন, ‘হে আল্লাহর রসুল দেখুন, আপনার হোসাইনের রক্ত ও মাটির ওপরে টুকরো টুকরে দেহ মরুভূমিতে পড়ে আছে। তাঁর দেহ মোবারকের ওপর ধূলিকণা। ইমাম হোসাইনের প্রতি ভালোবাসায় হৃদয়মাখা কান্নাজড়িত কণ্ঠের আওয়াজ শুনে কেউ চোখে পানি রাখতে পারিনি। সেদিন ইমাম হোসাইনের ভালোবাসায় হৃদয় ব্যথিত হয়েছে। আজও আশেকে হোসাইনরা তোমারই জন্য অশ্রু ঝরায়। তুমি অমর হয়ে আছ প্রতিটি আহলে বাইতপ্রেমিকদের অন্তরে। প্রতি বছর তোমাকে স্মরণ করে তোমার কোটি প্রেমিক লাব্বাইক ইয়া হোসাইন ও ইয়া হোসাইন ইয়া হোসাইন নামে তসবিহ জঁপে।
হে হোসাইনের প্রেমিকরা, উম্মতে মুহাম্মদিদের জন্য তাজা রক্ত বিলিয়ে দেওয়া ইমাম হোসাইনের জীবনের মূল্য কি আমরা দিতে পেরেছি? ইমাম হোসাইনকে কতটুকু ভালোবেসেছি। নিজেকে প্রশ্ন করি? সারাটি বছর হোসাইনের ভালোবাসা আঁকড়ে ধরে তাঁর আদর্শে আদর্শিত হওয়া জরুরি। সত্য, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করাসহ অন্যের হক নষ্ট করব না। হালাল অর্জন করব। শিরক বিদায়াতমুক্ত জীবন সাজাব। যদি আমার এই হৃদয় হোসাইনের জন্য কষ্ট না পায় তাহলে বুঝতে হবে হৃদয় পাষাণ হয়ে গিয়েছে। হৃদয়কে ইমাম হোসাইনের তরে বিলিয়ে দিতে হবে। হোসাইনকে ভালোবাসা ব্যতীত ইমানদার হওয়া যাবে না। এজন্য তোমাকে ভালোবাসি ইয়া হোসাইন। তিরমিজি শরিফে উল্লেখ রয়েছে, রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার হাসান ও হোসাইনের হাত ধরে বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমাকে ও এই দুজনকে ভালোবাসল এবং এঁদের মাতাপিতাকে ভালোবাসল সে কিয়ামত দিবসে আমার সঙ্গে আমার ঠিকানায় থাকবে।’
♦ লেখক : প্রধান গবেষক, আল ফুরকান রিসার্চ সেন্টার, ঢাকা
বিডি-প্রতিদিন