প্রতীকী ছবি
ঘরে যেভাবে বরকত ও শান্তি আসে
উম্মে আহমাদ ফারজানা
বরকত হলো কোনো কিছুর মধ্যে কল্যাণের স্থায়িত্ব, অব্যাহত থাকা এবং বৃদ্ধি পাওয়া। যেমন বলা হয়-‘অল্প হলেও বরকতময় জিনিস, বরকতহীন বেশি জিনিসের চেয়ে উত্তম।’ তাই একজন মুসলিমের উচিত নিজের ঘরে বরকত আসার কারণগুলো অনুসন্ধান করা এবং সেগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করা, যাতে সে নিজে উপকৃত হয় এবং তার ঘরে কল্যাণ বৃদ্ধি পায়। প্রথম ও প্রধান কারণ আল্লাহর তাকওয়ার ওপর ঘর প্রতিষ্ঠা করা। এটাই মূল ভিত্তি।
আল্লাহর তাকওয়া হলো ফরজ ও আবশ্যক কাজগুলো যথাযথভাবে পালন করা, হারাম কাজ থেকে বিরত থাকা, উপার্জন ও রিজিকের ক্ষেত্রে হালাল পথ অবলম্বন করা, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহকে ভয় ও স্মরণ করা।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যদি জনপদের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তাহলে আমি অবশ্যই তাদের ওপর আসমান ও জমিনের বরকতসমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম…।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৯৬) অতএব, ঘরের বরকতের প্রথম ভিত্তি হলো আল্লাহর আনুগত্য ও তাকওয়া।
ঘরে প্রবেশের সময় আল্লাহকে স্মরণ করা : জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছেন, কোনো ব্যক্তি যখন তার ঘরে প্রবেশের সময় এবং খাবারের সময় আল্লাহকে স্মরণ করে, তখন শয়তান বলে, এখানে আজ তোমাদের রাত কাটানোরও সুযোগ নেই, খাবারেরও সুযোগ নেই। আর যখন সে ঘরে প্রবেশের সময় আল্লাহকে স্মরণ করে না, তখন শয়তান বলে, তোমরা রাত কাটানোর স্থান পেয়ে গেছ। আর খাবারের সময় আল্লাহর নাম না নিলে সে বলে, তোমরা রাত কাটানোর স্থান ও খাবার-দুটিই পেয়ে গেছ। (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৭৬৫)
তাই ঘরকে সুন্দর ও সমৃদ্ধ করার মাপকাঠি শুধু তার বাহ্যিক সৌন্দর্য, বড় আকার বা প্রচুর অর্থ ব্যয় করা নয়। এগুলো ক্ষণস্থায়ী বিষয়। হয়তো মানুষের চোখে কোনো ঘর খুব সাধারণ, কিন্তু আসমানে সেই ঘরের মর্যাদা অনেক বেশি।
পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সালামের প্রচলন করা : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতঃপর যখন তোমরা কোনো ঘরে প্রবেশ করবে, তখন তোমরা পরস্পরের প্রতি সালাম করবে, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে বরকতময় ও পবিত্র অভিবাদন।’ (সুরা : নূর, আয়াত : ৬১)
তাই সবার আগে যে ঘরে সালাম দেওয়া উচিত তা হলো নিজের ঘর। কেননা বরকতের সবচেয়ে বেশি অধিকারী তো আপনার নিজের ঘর, সন্তান ও পরিবার।
ঘরে কোরআন তিলাওয়াত করা : আল্লাহ কোরআনকে বরকতময় করেছেন। তাই এর তিলাওয়াত, বোঝা এবং তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা ঘরে বরকত নিয়ে আসে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর এটি এমন এক কিতাব, যা আমি অবতীর্ণ করেছি, বরকতময়।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ৯২)
ইতিহাস সাক্ষী, সাহাবিদের অনেক ঘরে এমনভাবে কোরআন তিলাওয়াত হতো যে সেসব ঘর যেন মৌমাছির গুঞ্জনের মতো কোরআনের আওয়াজে মুখরিত থাকত। (বুখারি, হাদিস : ৪৭৩০)
ঘরে নফল নামাজ আদায় করা : ঘরে নফল নামাজ আদায় বরকত লাভের কারণ। জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমাদের কেউ যখন মসজিদে তার নামাজ শেষ করে, তখন সে যেন তার ঘরের জন্যও তার নামাজের একটি অংশ রাখে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তার নামাজের কারণে তার ঘরে কল্যাণ সৃষ্টি করবেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৭৭৮) অর্থাৎ মসজিদে ফরজ নামাজ আদায়ের পাশাপাশি ঘরকে নফল ইবাদতের স্থান বানানো উচিত।
ঘরের জন্য বরকতের দোয়া করা : দোয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়, কিন্তু আমরা প্রায়ই তা ভুলে যাই। নবী-রাসুলরা নিজেদের ঘর, পরিবার ও অবস্থানের জন্য আল্লাহর কাছে বরকত প্রার্থনা করতেন।
নুহ (আ.)-এর দোয়ার কথা আল্লাহ তাআলা উল্লেখ করেছেন, ‘আর বলো, হে আমার রব! আমাকে বরকতময় স্থানে অবতরণ করান; আর আপনিই সর্বোত্তম অবতরণকারী।’ (সুরা : মুমিনুন, আয়াত : ২৯) অর্থাৎ, হে আমার রব! আমাকে এমনভাবে অবতরণ করান বা এমন স্থানে অবতরণ করান, যা বরকতময়, যেখানে কল্যাণ ও বরকত পরিপূর্ণ।
এ থেকে আমরা শিখি যে শুধু ঘর সুন্দর করা বা সেখানে অনেক সম্পদ জমা করাই যথেষ্ট নয়; বরং ঘর ও পরিবারের জন্য আল্লাহর কাছে বরকত চাওয়াও জরুরি।
একটি বরকতময় ঘর শুধু দামি আসবাব, বড় বাড়ি বা প্রচুর সম্পদের মাধ্যমে তৈরি হয় না; বরং ঘরের প্রকৃত সৌন্দর্য ও বরকত আসে তাকওয়া, আল্লাহর জিকির, সালাম, কোরআন তিলাওয়াত, নামাজ, দোয়া এবং পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আল্লাহভিত্তিক ভালোবাসা ও শান্তির পরিবেশ থেকে।
বিডি প্রতিদিন