চা শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ: এমপি মুজিবুর
শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি
মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী বলেছেন, “চা কেবল একটি পানীয় নয়, এর সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের সমৃদ্ধ ইতিহাস, অর্থনীতি এবং লাখো মানুষের জীবিকা।”
শনিবার (২০ জুন) মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল অডিটরিয়াম কাম মাল্টিপারপাস হলে আয়োজিত ‘৬ষ্ঠ জাতীয় চা দিবস ২০২৬’ উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সংসদ সদস্য বলেন, “বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে চা চাষের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। বর্তমানে দেশে ১৬০টিরও বেশি চা বাগান এবং অসংখ্য ক্ষুদ্র চা চাষি আমাদের জাতীয় অর্থনীতিকে এক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে গেছে। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিদেশে চা রপ্তানি করা আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়।”
চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বারোপ করে তিনি আরও বলেন, “চা বাগানে কর্মরত নারী শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, উন্নত বাসস্থান, সুচিকিৎসা এবং শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা আমাদের সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। চা শিল্পের টেকসই উন্নয়নের জন্য শ্রমিকদের কল্যাণে আমাদের আরও মনোযোগী হতে হবে।”
‘চা শিল্পের উন্নতি, সবুজ হোক অর্থনীতি’ এই দিবসটির প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান বলেন, ‘দেশের চা শিল্পের টেকসই উন্নয়ন এবং চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে সরকার আন্তরিক ও প্রতি শ্রুতিবদ্ধ।’
তিনি বলেন, ‘চা শিল্পের উন্নয়নে শ্রমিক, মালিক, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে সমন্বয় ও সহমর্মিতা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে চা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও কল্যাণ নিশ্চিত করার বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।’
স্বাগত বক্তব্যে বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘চা শিল্পের আধুনিকায়নে বাংলাদেশ চা বোর্ডের সব কার্যক্রম ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থা ডিজিটাল করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশের চা শিল্পের তথ্যভান্ডার সমৃদ্ধ করতে ‘বাংলাদেশ টি ইন্ডাস্ট্রি’ এবং ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ি’ নামে দুটি মোবাইল অ্যাপ চালু করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল ও উন্নতমানের বিভিন্ন ক্লোন চা উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। চা শিল্পকে বহুমাত্রিক ও রপ্তানিমুখী করতে জেসমিন টি, রোজ টি, লেমন টি, মাসালা টি ও চকোলেট টি-সহ বিভিন্ন ভ্যালু অ্যাডেড চা উৎপাদনে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।
এছাড়া অনুষ্ঠানে চা শিল্পের বিভিন্ন অংশীজন, টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহ মাঈন উদ্দিন আহমদ বাংলাদেশ চা সংসদের সভাপতি কামরান টি রহমান, বট লিফ টি মালিক সমিতির সভাপতি নিয়াজ সিদ্দিকী, বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পালসহ চা শ্রমিক প্রতিনিধিরা তাদের গুরুত্বপূর্ণ মতামত তুলে ধরেন।
চা দিবসে অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ”আমরা চা শিল্পের গুণগত মান নিশ্চিতকরণ এবং উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি। এই লক্ষ্য অর্জনে বাগান মালিকসহ সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের সাথে নিবিড় সমন্বয় ও যৌথ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, যাতে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি চায়ের অবস্থান আরও সুসংহত হয়।”
চা দিবসে চা শিল্পে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আটটি ভিন্ন ক্যাটাগরিতে সংশ্লিষ্টদের পুরস্কার প্রদান করা হয়।
৬ষ্ঠ জাতীয় চা দিবসের এবার একর প্রতি সর্বোচ্চ উৎপাদনকারী চা বাগান হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে শ্রী গোবিন্দপুর চা বাগান। সর্বোচ্চ গুণগতমানসম্পন্ন চা উৎপাদনকারী বাগানের স্বীকৃতি পেয়েছে মধুপুর চা বাগান। শ্রেষ্ঠ চা রপ্তানিকারকের পুরস্কার অর্জন করেছে দি কনসোলিডেটেড টি অ্যান্ড ল্যান্ডস কোম্পানি (ফিনলে) লিমিটেড। শ্রেষ্ঠ ক্ষুদ্রায়তন চা উৎপাদনকারী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার সোনাপাতিলা গ্রামের মো. মতিয়ার রহমান। শ্রমিক কল্যাণে বিশেষ অবদানের জন্য শ্রেষ্ঠ চা বাগানের সম্মাননা পেয়েছে মির্জাপুর চা বাগান।
এছাড়া চা পণ্যের উদ্ভাবনী বাজারজাতকরণ এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ ও মানসম্পন্ন চা মিশ্রণ বাজারজাতকরণের স্বীকৃতি হিসেবে দুটি পৃথক ক্যাটাগরিতে বিশেষ পুরস্কার অর্জন করেছে কাজী অ্যান্ড কাজী টি এস্টেট লিমিটেড।
শ্রমিক সম্পর্কিত ক্যাটাগরিতে শ্রেষ্ঠ চা-পাতা চয়নকারী হিসেবে সম্মাননা পেয়েছেন নেপচুন চা বাগানের জেসমিন ওরাওঁ। জাতীয় চা দিবসের বিশেষ পুরস্কার হিসেবে শ্রেষ্ঠ বটলিং চা কারখানা নির্বাচিত হয়েছে পঞ্চগড় সদর উপজেলার জগদল এলাকায় অবস্থিত সৃষ্টি টি লিমিটেড।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব পুরস্কার দেশের চা শিল্পে উৎপাদন বৃদ্ধি, গুণগত মানোন্নয়ন, উদ্ভাবনী উদ্যোগ এবং শ্রমিক কল্যাণে ইতিবাচক প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করবে এবং বাংলাদেশের চা শিল্পকে আরও এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এর আগে বেলুন ও ফেস্টুন উড়িয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন প্রধান অতিথি ও চা বোর্ডের কর্মকর্তারা।