• সিলেট, সকাল ৬:১০, ২৬শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ব্যাংক কর্মকর্তা থেকে ব্যাংক লুটেরা

admin
প্রকাশিত নভেম্বর ৯, ২০২৫
ব্যাংক কর্মকর্তা থেকে ব্যাংক লুটেরা

Manual8 Ad Code

ব্যাংক কর্মকর্তা থেকে ব্যাংক লুটেরা

Manual1 Ad Code

লুটতন্ত্রের প্রতীক নাফিজ সরাফত – ১ম পর্ব
বিশেষ প্রতিনিধি

 

২০০৯ সালের আগে তাঁকে কেউ চিনত না। ছিলেন সামান্য একজন চাকরিজীবী। একটি ব্যাংকের মাঝারি স্তরের কর্মী ছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর হঠাৎ করেই যেন পেয়ে গেলেন আলাদিনের চেরাগ। রাতারাতি ফুলেফেঁপে উঠলেন। মাত্র ১৫ বছরে হয়ে গেলেন হাজার কোটি টাকার মালিক! রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এ রকম লুটপাট নজিরবিহীন। আর এ বিপুল সম্পদ গড়তে পদে পদ করেছেন প্রতারণা, দুর্নীতি। চৌধুরী নাফিজ সরাফত, আওয়ামী লীগের শাসনামলে দুর্নীতির প্রতীক। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে ১৯৯৯ সালে চাকরিজীবন শুরু করেন চৌধুরী নাফিজ সরাফত। বিদেশি এ ব্যাংকে থাকার সময় হঠাৎ করেই বেসরকারি আইএফআইসি ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক হন তিনি। এক ব্যাংকে চাকরি আর অন্য ব্যাংকে পরিচালক, এমন প্রশ্ন ওঠার পর তিনি স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে দেন। ২০০৮ সালে তিনি যোগ দেন আইসিবি ইসলামিক ব্যাংকে। হন কনজুমার ব্যাংকিংয়ের প্রধান। ভিজিটিং কার্ডে তিনি নিজের পরিচয় ‘এমডি, কনজুমার ব্যাংকিং, আইসিবি গ্লোবাল হোল্ডিংস’ ব্যবহার করতেন।

তার আগেই চৌধুরী নাফিজ সরাফত একটি মিউচুয়াল ফান্ডের লাইসেন্স নেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) থেকে। লাইসেন্সের জন্য প্রথমে নিজের নামে আবেদন করেছিলেন। যেহেতু ব্যক্তির নামে লাইসেন্স দেওয়া হয় না, তাই বিএসইসি সদস্য মোহাম্মদ আলী খানের পরামর্শে পরে তিনি কোম্পানি গঠন করেন। এ কোম্পানিরই নাম ‘বাংলাদেশ রেস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট’, যাতে তাঁর মালিকানা ২৫ শতাংশ। বাকি মালিকানা অন্য অংশীদার হাসান ইমামের। বিএসইসিতে তখন যাঁরা চাকরি করতেন, তাঁরা এসব তথ্য জানিয়েছেন।

আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর থেকেই বিভিন্ন খাতের অন্যতম প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন নাফিজ সরাফত। শুরুতে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীরের সঙ্গে সম্পর্ক গড়েন। পরে তাঁর সখ্য গড়ে ওঠে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের সঙ্গে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও তাঁর সুসম্পর্কের চিত্র গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। গোপালগঞ্জের এই ব্যক্তি শেখ হাসিনাকে ‘ফুপু’ বলে সম্বোধন করতেন। আর সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ছিলেন তাঁর ‘চাচা’। গোপালগঞ্জের মানুষ সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে ‘কাজিন’ হিসেবে অন্যদের কাছে পরিচয় দিতেন।

শেখ হাসিনার উপদেষ্টা ও বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান, এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদারের সঙ্গে নাফিজ সরাফতের সম্পর্কের কথা ব্যাংক ও পুঁজিবাজারের প্রায় সবারই জানা।

Manual5 Ad Code

মাত্র ১৩ বছরে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যাংক, পুঁজিবাজার, বিদ্যুৎ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, গণমাধ্যমসহ আরও কিছু খাতে রহস্যজনক কিন্তু অপ্রতিরোধ্য ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি পান নাফিজ সরাফত। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, তিনি মালিক হন হাজার কোটি টাকার। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নাফিজ সরাফতের সম্পদ অনুসন্ধান করতে দুদক তিন সদস্যের দল গঠন করেছে। নাফিজ সরাফত চেয়েছেন কিন্তু হয়নি, পুঁজিবাজারে এমন ঘটনা নেই বলে জানান বাজারসংশ্লিষ্টরা। ইবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড দিয়ে রেস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের যাত্রা। বর্তমানে মেয়াদি ও অমেয়াদি মিলিয়ে রেসের ফান্ড রয়েছে ১৩টি।

১০টি ফান্ডের সর্বোচ্চ মেয়াদ ১০ বছর ছিল। কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও এগুলোর অবসায়ন হয়নি, নাফিজ সরাফতের তদবিরে বরং আরও ১০ বছর বেড়েছে। তখন বিএসইসির চেয়ারম্যান ছিলেন এম খায়রুল হোসেন। তিনি বলেন, ‘তহবিলগুলোর মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাব শুরুতেই আমি নাকচ করে দিয়েছিলাম। প্রয়াত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত তখন চিঠি দিয়ে বললেন, এটা দেওয়া যায়। তখন দিতে হয়েছিল।’

তিনি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ন্যাশনাল টি কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার পরিচালক নির্বাচিত হন ২০২১ সালে। গত ৩০ জুন শেষে রেস পরিচালিত তহবিলগুলোর ক্রয়মূল্যে সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা, যার বাজারমূল্য ২ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) মাধ্যমে গত জুন থেকে রেস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের তহবিলগুলোর ব্যাংক হিসাবের লেনদেন স্থগিত রয়েছে।

বেস্ট হোল্ডিংসকে সরাসরি তালিকাভুক্তির মাধ্যমে বাজারে আনার পাশাপাশি ছোট প্রতিষ্ঠান কপারটেক ইন্ডাস্ট্রিজের আইপিও অনুমোদনেও তদবিরে নেমেছিলেন নাফিজ। কপারটেকের আর্থিক প্রতিবেদন তৈরিতে জালিয়াতির অভিযোগ ওঠায় নিরীক্ষক আহমেদ অ্যান্ড আখতারের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছিল তখন ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি)। নাফিজ সরাফত ক্ষমতাচ্যুত সরকারের আমলের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী এক ইকোনমিক হিটম্যান।

নাফিজ সরাফতের প্রভাব-প্রতিপত্তি আরও বাড়তে শুরু করে ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর। সে সময় নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য বেশ কিছু বিদেশি পর্যবেক্ষক বাংলাদেশে এসেছিলেন। তাঁরা সেই বিতর্কিত নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলে মত দিয়েছিলেন। এ বিদেশি পর্যবেক্ষকদের আনার ক্ষেত্রে মূল দায়িত্ব পালন করেছিলেন নাফিজ সরাফত। এর পর থেকেই তিনি সরকারের আরও আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। নাফিজ সরাফতের ব্যাংক দখল নিয়ে ফেসবুকে কার্টুন আঁকার অপরাধে ২০২০ সালের মে মাসে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার হন কার্টুনিস্ট আহমেদ কবীর কিশোর ও লেখক মুশতাক আহমেদ। সে বছরের ২ মে কার্টুনিস্ট কিশোরকে বাসা থেকে তুলে নেওয়া হয়। মুশতাক আহমেদকে তুলে নেওয়া হয় ৪ মে। আটকের পর তাঁদের মারাত্মক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। এরপর ৫ মে তাঁদের র‌্যাবের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। সে সময় ১০ মাসের মধ্যে অন্তত ছয়বার তাঁদের জামিনের আবেদন নাকচ হয়ে যায়। আটক অবস্থায় ২০২১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে মুশতাক আহমেদ মারা যান। ওই বছরের মার্চে জামিনে ছাড়া পান কিশোর। ছাড়া পাওয়ার পর গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কিশোর জানিয়েছিলেন, তাঁকে হেফাজতে নিয়ে নির্যাতনের সময় একটি ব্যাংকের চেয়ারম্যানকে নিয়ে কার্টুন আঁকার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছেন, কিশোর ও মুশতাককে নির্যাতনের সময় নাফিজ সরাফতও উপস্থিত ছিলেন।

Manual7 Ad Code

মূলত কার্টুন আঁকার কারণে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে দিয়ে কিশোর ও মুশতাককে অমানুষিক নির্যাতন করিয়েছিলেন নাফিজ সরাফত। ২০২১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি মুশতাক আহমেদের মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় সে সময় শোক ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক, নরওয়ে, স্পেন, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত এবং যুক্তরাজ্য ও কানাডার হাইকমিশনার।

এ ১৩ দেশের রাষ্ট্রদূতেরা তাঁদের বিবৃতিতে কী পরিস্থিতিতে মুশতাক আহমেদের মৃত্যু ঘটেছে তার দ্রুত, স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্তের আহ্বান জানান।

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল বাশেলেটও সে সময় বাংলাদেশের কারা হেফাজতে লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর ঘটনা ও কার্টুনিস্ট কিশোরকে নির্যাতনের অভিযোগের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে দ্রুত, স্বচ্ছ ও স্বতন্ত্র তদন্ত নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচও এক বিবৃতিতে মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্তের আহ্বান জানিয়েছিল। দেশেও কিশোর ও মুশতাকের ওপর নির্যাতনের ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেয় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও টিআইবি।

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সম্প্রতি দুদকের পক্ষ থেকে নাফিজ সরাফতের ব্যাংক দখল ও পুঁজিবাজার থেকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে তদন্ত শুরু হয়েছে।

 

বিডি প্রতিদিন

Manual3 Ad Code

Latif Travels
Metropolitan University

আপনার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন

📞 মোবাইল: +8801712540420

✉️ ইমেইল: pavel.syl@gmail.com