কোরআন আত্মপরিচয়ের আয়না
উম্মে আহমাদ ফারজানা
মানুষ যখন কোরআন তিলাওয়াত করে, তখন সাধারণত সে গল্প, বিধান বা উপদেশ খোঁজে; কিন্তু খুব কম মানুষই নিজেকে খোঁজে। অথচ কোরআন শুধু পড়ার কিতাব নয়, এটি আত্মপরিচয়ের আয়না, যেখানে প্রত্যেক মানুষ নিজের অবস্থান দেখতে পায়। এই উপলব্ধিই গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল প্রখ্যাত তাবেঈ আহনাফ ইবনে কায়সকে। তিনি কোরআনের আয়াতগুলো পড়তে পড়তে খুঁজতে চেয়েছিলেন—তিনি আসলে কোন দলের মানুষ? নেককারদের দলে, নাকি গাফেলদের কাতারে? তাঁর এই অনুসন্ধান শুধু একটি ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়; বরং আমাদের প্রত্যেকের আত্মজিজ্ঞাসা হওয়া উচিত—কোরআনে আমি কোথায়?
প্রখ্যাত তাবেঈ আহনাফ ইবনে কায়স (রহ.) এক দিন বসে ছিলেন।
এমন সময় এক ব্যক্তি তাঁর পাশ দিয়ে যেতে যেতে কোরআনের এই আয়াত তিলাওয়াত করে, ‘আমি তোমার প্রতি এমন এক কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যাতে তোমার উল্লেখ আছে। তবে কি তোমরা চিন্তা-ভাবনা করবে না?’
(সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ১০)
এই আয়াতটি তাঁর হৃদয়কে গভীরভাবে আলোড়িত করে, তাঁর কাছে মনে হলো যেন এটি সরাসরি তাঁকেই উদ্দেশ করে বলা হয়েছে। বিনয় ও আন্তরিকতার সঙ্গে তিনি বললেন, ‘আমার কাছে কোরআন নিয়ে আসো, যাতে আমি দেখতে পারি—এতে আমার উল্লেখ কোথায় আছে, আমি কোন শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত, আর কার সঙ্গে আমার মিল রয়েছে।’ তাঁর আদেশে তাঁর কাছে কোরআন আনা হয়।
এবার তিনি গভীর মনোযোগে আয়াতগুলো পড়তে লাগলেন এবং নিজের অবস্থান খুঁজতে থাকলেন। প্রথমে তিনি এমন এক দলের বর্ণনা পেলেন, ‘যারা রাতের অল্প অংশই ঘুমায়, ভোরের আগে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং তাদের সম্পদে অভাবী ও বঞ্চিতদের নির্ধারিত অধিকার থাকে।’ (সুরা : জারিয়াত, আয়াত : ১৭-১৯)
এরপর তিনি আরেক দলের কথা পড়লেন, ‘যাদের পাঁজর বিছানা থেকে পৃথক হয়ে যায়; তারা ভয় ও আশার সঙ্গে তাদের রবকে ডাকতে থাকে এবং তাদের যা দেওয়া হয়েছে, তা থেকে ব্যয় করে।’ (সুরা : সাজদাহ, আয়াত : ১৬)
তারপর তিনি পড়লেন, ‘যারা সিজদা ও দাঁড়িয়ে থেকে রাত কাটায়।’
(সুরা : ফুরকান, আয়াত : ৬৪)
আরেক দল—‘যারা সুখে-দুঃখে ব্যয় করে, ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে; আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’
(সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৩৪)
এরপর তিনি এমন মানুষদের কথা পড়লেন, ‘যারা নিজেদের অভাব থাকা সত্ত্বেও অন্যদের নিজেদের ওপর প্রাধান্য দেয়; আর যারা অন্তরের কৃপণতা থেকে রক্ষা পায়, তারাই সফল।’ (সুরা : আল-হাশর, আয়াত : ৯)
তারপর আরেক দল—‘যারা বড় পাপ ও অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকে, আর ক্রুদ্ধ হলে ক্ষমা করে দেয়।’ (সুরা : শুরা, আয়াত : ৩৭)
এবং বর্ণিত হয়েছে—‘যারা তাদের রবের ডাকে সাড়া দেয়, সালাত কায়েম করে, পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে কাজ করে এবং তাদের যা দেওয়া হয়েছে তা থেকে ব্যয় করে।’
(সুরা : শুরা, আয়াত : ৩৮)
একনাগাড়ে এসব আয়াত পড়ে আহনাফ ইবনে কায়স দীর্ঘক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকলেন।
মাথা নিচু করে গভীর অনুশোচনায় ভরে উঠল তাঁর হৃদয়। এক পর্যায়ে তিনি বলে উঠলেন, ‘হে আল্লাহ! আপনি আমার অবস্থা সবচেয়ে ভালো জানেন। কিন্তু আমি নিজেকে এদের কারো মধ্যেই খুঁজে পাচ্ছি না।’
এরপর তিনি আরেকটি পৃষ্ঠা উল্টালেন। সেখানে তিনি এমন এক জাতির বর্ণনা পেলেন, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “যখন তাদের বলা হতো, ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই,’ তখন তারা অহংকারে মুখ ফিরিয়ে নিত এবং বলত, ‘আমরা কি এক উন্মাদ কবির কথায় আমাদের উপাস্যদের ত্যাগ করব?”
(সুরা : সাফফাত, আয়াত : ৩৫-৩৬)
তারপর তিনি আরেক দলের কথা পড়লেন, ‘যখন একমাত্র আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়, তখন যারা আখিরাতে বিশ্বাস করে না, তাদের অন্তর বিতৃষ্ণায় সংকুচিত হয়ে যায়।’
(সুরা : জুমার, আয়াত : ৪৫)
এরপর তাঁর সামনে ভেসে উঠল এক ভয়াবহ দৃশ্য—জাহান্নামের অধিবাসীদের জিজ্ঞেস করা হচ্ছে, ‘কী তোমাদের জাহান্নামে নিয়ে এলো?’
তারা বলবে, ‘আমরা নামাজ আদায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না, আমরা দরিদ্রদের আহার দিতাম না, অর্থহীন কথাবার্তায় লিপ্তদের সঙ্গে আমরা মেতে থাকতাম, আর আমরা বিচার দিবসকে অস্বীকার করতাম—অবশেষে আমাদের কাছে মৃত্যু চলে আসে।’
(সুরা : মুদ্দাসসির, আয়াত : ৪২-৪৭)
এবার এই আয়াতগুলো পড়ে আহনাফ ইবনে কায়স ভয়ে কেঁপে উঠলেন। তিনি দুই হাতে নিজের কান ঢেকে আতঙ্ক ভরে বললেন, ‘হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাই, আমি যেন এদের অন্তর্ভুক্ত না হই। আমি তোমার সামনে নিজেকে এদের থেকে মুক্ত ঘোষণা করছি!’
এরপর তিনি অশ্রুসজল চোখে, গভীর আন্তরিকতা নিয়ে আবার কোরআনের পাতা উল্টাতে লাগলেন, নিজের অবস্থান খুঁজে পাওয়ার আকুলতায়। অবশেষে তিনি পৌঁছলেন এই আয়াতে, ‘আর কিছু লোক আছে, যারা নিজেদের পাপ স্বীকার করেছে। তারা সৎ কাজের সঙ্গে অসৎ কাজ মিশিয়ে ফেলেছে। আশা করা যায়, আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা : তাওবাহ, আয়াত : ১০২)
এই আয়াতটি পড়া মাত্র তাঁর মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। আশায় ভরা কণ্ঠে তিনি বলে উঠলেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ! এটাই তো আমি! এটাই আমার অবস্থা!’ এই ঘটনা আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে নাসর আল-মারওয়াজি তাঁর ‘কিয়ামুল লাইল’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।
এই ঘটনা আমাদের সামনে এক বাস্তব চিত্র তুলে ধরে—কোনো মানুষ নিখুঁত নয়, বরং সে ভুল ও সঠিকের সংমিশ্রণ। অতএব, আহনাফের সেই উপলব্ধি—‘এটাই আমি’ আসলে এক ধরনের জাগরণ; নিজের দুর্বলতা মেনে নিয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার সাহস। তাই এই বর্ণনা আমাদের শেখায়, কোরআন পড়া মানে শুধু শব্দ উচ্চারণ নয়; বরং প্রতিটি আয়াতে নিজেকে খুঁজে দেখা, নিজেকে সংশোধন করা এবং আল্লাহর কাছে ফিরে আসার পথ খুঁজে নেওয়া। প্রশ্নটি তাই আজও আমাদের সামনে রয়েই যায়—‘কোরআনে আমি কোথায়?’
বিডি প্রতিদিন