সংগৃহীত ছবি
মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে কাজ করবে সংসদীয় ককাস
বাসস
মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্য জানার অধিকার ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে কাজ করবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নবগঠিত মানবাধিকার ও শান্তিবিষয়ক সংসদীয় ককাস।
বুধবার ককাসের সভাপতি অ্যাডভোকেট ফাহিমা নাসরিন সংসদ ভবনে সংসদীয় ককাসের প্রথম বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানান।
তিনি বলেন, মানুষ যেন স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারে, নিজের মত প্রকাশ করতে পারে, প্রয়োজনীয় তথ্য জানতে পারে এবং নিরাপদে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে, তা নিশ্চিত করাই হবে ককাসের মূল লক্ষ্য। সংসদের ভেতরে ও বাইরে মানবাধিকার-সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে এই ককাস কাজ করবে।
জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে সংসদ ভবনের টানেলে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে ফাহিমা নাসরিন বলেন, দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দেশে গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ নানা ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। এনকাউন্টারের নামে লাশ নদীতে ফেলে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনা দেশ-বিদেশে সবারই জানা। বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জনগণের প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানো এবং মানবাধিকার রক্ষায় এই ককাস কাজ করবে।
তিনি জানান, বৈঠকে মূলত ককাসের কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এই প্রথম মানবাধিকার বিষয়ক সংসদীয় ককাস গঠন করা হয়েছে। বৈঠকে সদস্যরা মানবাধিকার লঙ্ঘন, আইনের শাসন ও বিচারব্যবস্থাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে মতবিনিময় করেন।
নিয়মিত বৈঠকের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর ভূমিকা রাখার আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, নির্বাহী বিভাগের বাইরে থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করে মানুষের মতামত ও প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে চায় এই ককাস।
ফাহিমা নাসরিন বলেন, অতীতে দেশে ব্যাপক গুম, খুন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসে বর্তমান সরকার মানুষের মতামত ও অধিকারকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। মানবাধিকার রক্ষায় জবাবদিহি নিশ্চিত করে সমাজ ও রাষ্ট্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনাই সরকারের লক্ষ্য।
তিনি বলেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের যেকোনো ঘটনা মোকাবিলায় এই সংসদীয় ককাস কাজ করবে। এ ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি আইন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।
মানবাধিকার ও শান্তিবিষয়ক সংসদীয় ককাসের প্রথম বৈঠকে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালসহ সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী, সাঈদ আল নোমান, মীর আহমাদ বিনকাসেম, মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান, মো. আবুল হাসনাত, জহরত আদিব চৌধুরী, সানজিদা ইসলাম ও আন্না মিনজ অংশগ্রহণ করেন।
নবগঠিত এ ককাসের কর্ম পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনাপর্বে ডেপুটি স্পিকার বলেন, বিগত সময়ে যারা মানবাধিকার লংঘন করেছে এবং যারা ভিকটিম তাদের সনাক্ত করে একটি গ্রহণযোগ্য চিত্র তুলে ধরে ভবিষ্যতে যাতে এ ধরণের কর্মকান্ড আর সংঘটিত না হয় সে বিষয়ে সজাগ ও সচেতনতার সাথে কাজ করে যাওয়ার উদ্দেশে এই ককাস গঠন করা হয়েছে। মানবাধিকার লংঘনকারী যাতে ভিকটিম সাজার চেষ্টা না করে সে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করার আহবান জানান তিনি।
ডেপুটি স্পিকার নির্বাহী বিভাগকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করে এই ককাসের কর্মকান্ডকে ত্বরান্বিত করার আহবান জানান। বাংলাদেশে এর আগে এ ধরনের সংসদীয় ককাস গঠিত হয়নি উল্লেখ করে ডেপুটি স্পিকার বলেন, এই কমিটিকে একটি কার্যকারী কমিটি হিসেবে গড়ে তুলতে একটি টিম ওয়ার্ক হিসেবে সকলকে একযোগে কাজ করতে হবে। এ লক্ষ্যে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে ককাসটিকে একটি শক্তিশালী পরিকাঠামো হিসেবে দাঁড় করাতে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরে ককাস সভাপতি ফাহিমা নাসরিন বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি একটি নতুন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাত্র ৩৬ দিনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত এবং ৩০ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন। আহতদের অনেকে স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। এমনকি শিশুদেরও গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটেছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সময়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোনো ঘটনা ঘটলে তার কারণ ও প্রেক্ষাপট খতিয়ে দেখবে ককাস। এতে সরকারি ও বিরোধী দলসহ বিভিন্ন দলের সংসদ সদস্যরা রয়েছেন। এটি শুধু সরকারি দলের সদস্যদের নিয়ে গঠিত নয়। মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা চিহ্নিত করার পাশাপাশি সুষ্ঠু তদন্ত, বিচার এবং বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, সে বিষয়েও ককাস নজর রাখবে।
কমিটির কর্মপরিধি আরও সম্প্রসারিত করার লক্ষে ককাসের সভাপতি ও সদস্যবৃন্দ মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংগঠন, সংস্থা ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যোগাযোগ রক্ষা ও এসংক্রান্ত সভা সেমিনার ও গবেষণাকর্মে ককাসের সদস্যদের অংশগ্রহণের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন। পরবর্তী প্রজন্মকে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমুলক সরকার ,নিরপেক্ষ বিচার ব্যাবস্থা নিশ্চিতকরণে ভূমিকা রাখার আশাবাদ ব্যক্ত করেন ককাস সদস্যবৃন্দ ।
বৈঠকে জাতীয় সংসদ সচিবালয়, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।
বিডি প্রতিদিন